ইলমী গবেষণা ডীনশীপ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারা

অনুবাদ: মোহাম্মাদ ইবরাহীম আবদুল হালীম

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

১- হজর সংজ্ঞা:

হজের শাব্দিক অর্থ: ইচ্ছা করা। আরবী ভাষায় বলা হয়, অমুকে আমাদের নিকট হজ করেছে। অর্থাৎ সে আমাদের নিকট আসার ইচ্ছা করেছে ও আমাদের নিকট এসেছে।

হজের পারিভাষিক অর্থ: নির্ধারিত শর্তসহ নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ পদ্ধতিতে ইবাদাত করার জন্য মাক্কায় গমণের ইচ্ছা করাকে হজ বলে।

২- হজের হুকুম:

সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর তার জীবনে একবার হজ ফরয হওয়া এবং তা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, যার ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত, এ ব্যাপারে উম্মাত ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلِلَّهِ عَلَى ٱلنَّاسِ حِجُّ ٱلۡبَيۡتِ مَنِ ٱسۡتَطَاعَ إِلَيۡهِ سَبِيلٗاۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٧﴾ [ال عمران: ٩٧]

“মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য এবং কেউ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক আল্লাহ সৃষ্টিকুলের মুখাপেক্ষী নন”। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৯৭]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«بني الإسلام على خمس، شهادة أن لا إله إلا الله وأن محمداً رسول الله وإقام الصلاة وإيتاء الزكاة، وصوم رمضان وحج بيت الله».

“ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বুদ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল এ সাক্ষ্য দান করা। সালাত প্রতিষ্ঠা করা। যাকাত প্রদান করা। রামাদানের সিয়াম পালন করা। বায়তুল্লাহর হজ করা”।[1]

তিনি বিদায় হজের ভাষণে আরো বলেন,

«يا أيها الناس إن الله فرض عليكم حج البيت فحجوا».

“হে লোকসকল! আল্লাহ তোমাদের ওপর বায়তুল্লাহর হজ ফরয করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ কর”।[2]

৩- হজের ফযীলত ও তা প্রবর্তনের পিছনে হিকমাত:

হজের ফযীলতে অনেক দলীল বর্ণিত হয়েছে:

তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আল্লাহর বাণী:

﴿وَأَذِّن فِي ٱلنَّاسِ بِٱلۡحَجِّ يَأۡتُوكَ رِجَالٗا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٖ يَأۡتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٖ ٢٧ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨﴾ [الحج : ٢٧، ٢٨]

“এবং মানুষের নিকট হজ এর ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রসমূহের পিঠে, তারা আসবে দূর-দূরান্তর পথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থান গুলিতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুস্পদ জন্তু থেকে যাহা রিযিক হিসাবে দান করেছেন উহার ওপর নির্দিষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারবে”। [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ২৭-২৮]

আর হজ সকল মুসলিমের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে অনেক কল্যাণ অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছে। সুতরাং হজের মধ্যে নানা প্রকার ইবাদাতের সমাবেশ রয়েছে। যেমন,

কা‘বা শরীফের তাওয়াফ, সাফা মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ, আরাফাতে, মিনায়, মুদালিফায় অবস্থান, কঙ্কর নিক্ষেপ, মিনায় রাত্রিযাপন, হাদী জবেহ, মাথার চুল মুণ্ডানো, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য তাঁর কাছে বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করার জন্য ও তাঁর দিকে ধাবমান হওয়ার জন্য বেশি বেশি আল্লাহর যিকির। তাই হজ হলো পাপ মোচনের ও জান্নাতে প্রবেশের কারণসমূহের অন্যতম একটি কারণ।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«سمعت رسول الله r يقول: من حج هذا البيت فلم يرفث ولم يفسق رجع من ذنوبه كيوم ولدته أمه».

“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে ব্যক্তি এ ঘরের হজ করলো আর সে নির্লজ্জ কোনো কথা বার্তা ও ফাসেকী কোনো কর্মে লিপ্ত হলো না সে তার পাপ থেকে ফিরে আসলো সেই দিনের ন্যায় যে দিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল”।[1]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«العمرة إلى العمرة كفارة لما بينهما والحج المبرور ليس له جزاء إلا الجنة».

“এক উমরাহ থেকে অপর উমরাহ এ দুইয়ের মাঝে কৃত পাপের কাফ্ফারা। আর গৃহীত হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত”।[2]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,

«سئل رسول الله r أي الأعمال أفضل؟ قال: إيمان بالله ورسوله. قيل: ثم ماذا؟ قال: جهاد في سبيل الله. قيل: ثم ماذا؟ قال حج مبرور».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোনো কাজটি অতি উত্তম? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। বলা হলো, তার পর কোনোটি? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। বলা হলো তারপর কোনটি? তিনি বললেন, গৃহীত হজ”।[1]

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«تابعوا بين الحج والعمرة فإنهما ينفيان الفقر والذنوب كما ينفي الكير خبث الحديد والذهب والفضة، وليس للحجة المبرورة ثواب إلا الجنة».

“তোমরা হজ ও উমরাহ পর্যায়ক্রমে করতে থাক। কারণ, এ দু’টি দরিদ্রতা দূর করে আর পাপ মোচন করে। যেমন, কর্মকারের হাপর লোহার, সোনা ও রূপার মরিচা দূর করে। আর গৃহীত হজের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত”।[2]

বিশ্বের দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসলিমদের আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়স্থানে একে অপরের মিলন, পরস্পরের পরিচয় লাভ, কল্যাণ কর ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করার সুযোগ ও তাদের কথা কাজ ও যিকির এক হওয়া হজের উপকারিতার অন্তর্ভুক্ত।

এতে তাদের আক্বীদায়, ইবাদাতে, উদ্দেশ্য ও ওয়াসিলাতে ঐক্যের ও একত্রিত হওয়ার প্রশিক্ষণ রয়েছে। আর তাদের এ একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে তাদের মাঝে পরস্পর পরিচয় লাভ হয়, বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় ও এক অপর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পায় ও আল্লাহ তা‘আলার কথা বাস্তবায়িত হয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ ١٣ ﴾ [الحجرات: ١٣]

“হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। আল্লাহ সব কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন”। [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]

৪- হজ ফরয হওয়ার শর্তসমূহ:

(ক) হজ ফরয হয় পাঁচটি শর্তে এতে ফকীহগণের মতানৈক্য নেই। আর তা হলো:

ইসলাম বা মুসলিম হওয়া, জ্ঞানবান হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, স্বাধীন হওয়া ও সামর্থ্য থাকা। তবে মহিলার ওপর হজ ফরয হওয়ার জন্য হজের সফরে তার সাথে মাহরাম থাকা আবশ্যক। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لا يحل لامرأة تؤمن بالله واليوم الآخر تسافر مسيرة يوم إلا ومعها ذو محرم».

“আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এমন মহিলার জন্য বিনা মাহরামে (বিবাহ বন্ধন নিষিদ্ধ এমন পুরুষ) একদিনের দূরত্বের পথও সফর করা বৈধ নয়। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এ হাদীসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন”।[3]

ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ এ শর্তগুলোকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন:

প্রথমত: হজ সহীহ ও ফরয হওয়ার জন্য শর্ত, আর তা হলো, ইসলাম ও বিবেকসম্পন্ন হওয়া, তাই কাফির ও পাগলের ওপর হজ ফরয নয়। তাদের পক্ষ থেকে হজ শুদ্ধও হবে না। কারণ, তারা ইবাদাতকারীদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

দ্বিতীয়ত: যা ফরয ও যথেষ্ট হওয়ার জন্য শর্ত, আর তা হলো, প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন হওয়া, তাদের হজ সহীহ হওয়ার শর্ত নয়। তাই যদি বাচ্চা ও দাস হজ করে, তবে তাদের হজ শুদ্ধ হবে। কিন্তু তাদের এ হজ ইসলামের ফরয হজ হিসেবে যথেষ্ট হবে না।

তৃতীয়ত: যা শুধু ফরয হওয়ার জন্য শর্ত, আর তা হলো, সামর্থ্যবান হওয়া। তবে সামর্থ্যহীন ব্যক্তি যদি কষ্ট করে হজ করে এবং যদি পাথেয় ও যানবাহন ছাড়াই হজে চলে যায়, তবে তার হজ বিশুদ্ধ হয়ে যাবে।

(খ) হজ আদায়ে প্রতিনিধি নিযুক্ত করার বিধান

যে ব্যক্তি হজ আদায়ের সামর্থ্যবান হওয়ার পূর্বে মারা যাবে, তার ওপর ফরয হবে না। এতে ফকীহগণের মাঝে কোনো মতানৈক্য নেই। তবে যে ব্যক্তি হজ আদায়ের সামর্থ্যবান হওয়ার পর মারা যাবে, তার ওপর হতে মৃত্যুর কারণে ফরয বাদ হয়ে যাবে কি হবে না এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। তবে সঠিক মত হলো, মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে হজের ফরয বাদ হয়ে যাবে না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসদের ওপর তার পক্ষ থেকে তার মাল দ্বারা হজ করানো অপরিহার্য হবে, সে তার পক্ষ থেকে হজ আদায়ের অসিয়াত করে যান আর না-ই যান। তা তার ওপর অন্যান্য ঋণের মতই একটি হিসেবে আদায় করা ফরয সাব্যস্ত হবে। কারণ, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হাদীস বর্ণনা করেছেন। জনৈক মহিলা হজ করার মানত করে মারা যায়, অতঃপর তার ভাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

«أرأيت لو كان على أختك دين أكنت قاضيه؟ قال: نعم، قال: فاقضوا الله فهو أحق بالوفاء».

“তোমার কী মত? যদি তোমার বোনের ওপর ঋণ থাকতো তাহলে তুমি কি তা আদায় করতে না? সে বললো, হ্যাঁ। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর ঋণ আদায় কর, কারণ আল্লাহর ঋণ আদায় করা আরও অধিক যুক্তিযুক্ত”।[1]

(গ) যে ব্যক্তি নিজে হজ করে নি সে অন্যের পক্ষ থেকে বদল হজ করতে পারবে কি?

যে ব্যক্তি প্রথমে নিজের হজ করে নি সে অন্যের পক্ষ থেকে বদল হজ করতে পারবে না। এটাই ফকীহগণের মতামতের মধ্য থেকে সঠিক মত। কারণ, এ ব্যাপারে একটি প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে আর তা হলো,

«أن النبي r سمع رجلاً يقول: لبيك عن شبرمة، قال: من شبرمة؟ قال: أخ لي أو قريب لي، فقال عليه الصلاة والسلام: حجت عن نفسك؟ قال لا. قال: حج عن نفسك ثم حج عن شبرمة».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে লাব্বাইক ‘আন শুবরুমাহ বলতে শুনলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, শুবরুমাহ কে? সে বললো, আমার ভাই বা আমার নিকট আত্মীয়। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার হজ করেছ? সে বললো, না। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আগে তুমি নিজের হজ কর, তারপর শুবরুমার হজ করবে”।[2]

সামর্থ্যহীন অপারগ ব্যক্তির পক্ষ থেকে যদি কেউ বদলি হজ আদায় করে তবে সঠিক মতে তা আদায় করা শুদ্ধ হবে। কারণ, এ ব্যাপারে ফযল ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার একটি হাদীস রয়েছে, তাতে এসেছে,

«أن امرأة من خثعم قالت: يارسول الله إن فريضة الله على عباده في الحج أدركت أبي شيخاً كبيراً لا يثبت على الراحلة أفأحج عنه؟ قال: نعم وذلك في حجة الوداع».

“খাছ‘আমা গোত্রের জনৈক মহিলা বললো, হে আল্লাহর রাসূল ! আমার পিতা অতি বৃদ্ধ, তিনি যানবাহনে স্থির থাকতে পারেন না। তার ওপর আল্লাহর হজ ফরয হয়েছে। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে বদল হজ আদায় করতে পারবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তার পক্ষ থেকে বদল হজ কর। এ ঘটনা বিদায় হজে ঘটেছিল”।[3]

(ঘ) হজ অবিলম্বে ফরয না বিলম্বে ফরয?

হজ ফরয হওয়ার শর্ত পুরণ হওয়ার সাথে সাথেই হজ ফরয হবে, তা ফকীহগণের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। কারণ, এ ব্যাপারে আল্লাহর ব্যাপক বাণী এসেছে। যেমন,

﴿وَلِلَّهِ عَلَى ٱلنَّاسِ حِجُّ ٱلۡبَيۡتِ مَنِ ٱسۡتَطَاعَ إِلَيۡهِ سَبِيلٗاۚ﴾ [ال عمران: ٩٧]

“মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭]

আল্লাহর অন্য বাণী হলো,

﴿وَأَتِمُّواْ ٱلۡحَجَّ وَٱلۡعُمۡرَةَ لِلَّهِۚ ١٩٦﴾ [البقرة: ١٩٦]

“আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও উমরাহ পূর্ণ কর”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৬]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«تعجلوا إلى الحج، يعني الفريضة، فإن أحدكم لا يدري ما يعرض له».

“তোমরা ফরয হজের জন্য তাড়াতাড়ি কর। কেননা তোমাদের কেউই একথা জানে না যে, তার ভাগ্যে কি রয়েছে”।[4]

৫- হজের রুকনসমূহ:

হজের রুকন চারটি:

(ক) ইহরাম বাঁধা।

(খ) আরাফায় অবস্থান করা।

(গ) তাওয়াফুয যিয়ারা।

(ঘ) সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করা।

আর এ চারটি রুকনের কোনো একটি রুকন ছুটে গেলে হজ পূর্ণ হবে না।

প্রথম রুকন: ইহরাম বাঁধা

ইহরামের সংজ্ঞা: ইহরাম হলো, ইবাদাতে প্রবেশের নিয়াত করা।

হজের মীকাত: হজের ইহরাম বাঁধার মীকাত দু’ প্রকার:

(১) সময়ের মীকাত।

(২) স্থানের মীকাত।

সময়ের মীকাত: আর তা হলো,

হজের মাসসমূহ, যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡحَجُّ أَشۡهُرٞ مَّعۡلُومَٰتٞۚ ١٩٧﴾ [البقرة: ١٩٧]

“হজ হয় সুবিদিত মাসে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭]

আর তা হলো, শাওয়াল, যুলকা‘দা ও যুলহাজ্জাহ।

স্থানের মীকাত: আর তা হলো, ঐ সীমাসমূহ যা হাজী সাহেবদের জন্য বিনা ইহরামে অতিক্রম করে মক্কার দিকে যাওয়া বৈধ নয়। আর তা হলো পাঁচটি:

প্রথম: (যুলহুলাইফা) বর্তমানে এর নাম ‘‘আবারে আলী’’ তা মদিনাবাসীদের মীকাত, যা মক্কা থেকে (৩৩৬) কি. মি. অর্থাৎ ২২৪ মাইল দূরে অবস্থিত।

দ্বিতীয়: (আল-জুহফা) তা একটি গ্রাম, সে গ্রাম ও লোহিত সাগরের মাঝে দূরত্ব হলো (১০) কি. মি., যা মক্কা থেকে (১৮০) কি. মি. অর্থাৎ (১২০) মাইল দূরে অবস্থিত। আর তা মিসর, সিরীয়া, মরক্কো ও এদের পিছনে বসবাসকারী স্পেন, রূম ও তিক্রূরবাসীদের মীকাত। বর্তমানে মানুষ (রাবেগ) থেকে ইহরাম বাঁধে। কারণ, তা তার কিছুটা সমান দূরত্বে।

তৃতীয়: (ইয়ালামলাম) বর্তমানে তা (আসসা‘দীয়া) নামে পরিচিত। আর তা তুহামাহ (সারিবদ্ধ) পর্বতসমূহের একটি পর্বত। যা মক্কা থেকে (৭২) কি. মি. অর্থাৎ (৪৮) মাইল দূরে অবস্থিত। আর তা ইয়েমেন, আহলে জাওয়াহ, ভারতীয় উপমহাদেশের ও চীন বাসীদের মীকাত।

চতুর্থ: (ক্বারনুল মানাযেল) বর্তমানে এর নাম ‘‘আস-সাইলুল কাবীর’’ তা মক্কা থেকে (৭২) কি. মি. অর্থাৎ (৪৮) মাইল দূরে অবস্থিত। আর তা নাজদ ও ত্বায়েফবাসীদের মীকাত।

পঞ্চম: (যাতে ইর্ক্ব) তা বর্তমানে (আয্যারীবাহ) নামে পরিচিত, এর নাম যাতে ইর্ক্ব রাখা হয়েছে। কারণ, তথায় ইর্ক্ব আছে। আর ইর্ক্ব হলো ছোট পর্বত। যা মক্কা থেকে (৭২) কি. মি. অর্থাৎ (৪৮) মাইল দূরে অবস্থিত। তা প্রাচ্যবাসীদের, ইরাক্ব ও ইরানবাসীদের মীকাত।

এ হচ্ছে স্থানের মীকাত– এ নির্ধারিত সীমাসমূহ বিনা ইহরামে অতিক্রম করে মক্কার দিকে যাওয়া কোনো হজ ও উমরাহকারীর জন্য কোনোভাবেই বৈধ নয়।

এ মীকাতগুলো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করে গেছেন। যেমন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

«وقت رسول الله-r-لأهل المدينة ذا الحليفة، ولأهل الشام الجحفة، ولأهل نجد قرن المنازل، ولأهل اليمن يلملم، هن لهن ولمن أتى عليهن من غير أهلهن من أراد الحج أو العمرة، ومن كان دون ذلك فمن حيث أنشأ، حتى أهل مكة من مكة».

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা। আর সিরীয়াবাসীদের জন্য আল-জুহফাহ। আর নাজদবাসীদের জন্য ক্বারনুল মানাযেল। ইয়েমেনবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম নির্ধারণ করেছেন। ঐ মীকাতগুলো ঐ এলাকাবাসীদের জন্য। আর যারা হজ ও উমরাহ পালন করার উদ্দেশ্যে ঐ স্থানে পৌঁছবে, তাদের জন্যও মীকাত নির্ধারিত হলো। আর যারা মীকাতের ভিতরে অবস্থান করে তাদের ইহরাম বাঁধার স্থান হবে তাদের নিজস্ব অবস্থানস্থল, এমনকি মক্কার লোক মক্কাতেই ইহরাম বাঁধবে”।[5]

সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে আছে,

«مهل أهل العراق ذات عرق».

“ইরাক্ববাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান হলো যাতেইর্ক্ব”।[6]

যে ব্যক্তি ঐ মীকাতসমূহের কোনো একটি মীকাত দিয়ে অতিক্রম করবে না, সে ঐ সময় ইহরাম বাঁধবে যখন সে জানতে পারবে যে, সে ঐ মীকাতসমূহের একটি মীকাতের বরাবর হয়েছে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আকাশ পথে বিমানে আরোহণ করবে সে ঐ মীকাতসমূহের যে কোনো একটি মীকাতের নিকটবর্তী হলে ইহরাম বাঁধবে। বিমানে আরোহী ব্যক্তির জন্য জিদ্দা এয়ার পোর্টে নেমে ইহরাম বাঁধা ঠিক হবে না, যেমনটি কিছু হাজী সাহেবগণ করে থাকেন।

কারণ জিদ্দা শুধু জিদ্দাবাসীদের মীকাত বা জিদ্দা তাদের জন্য মীকাত যারা জিদ্দায় অবস্থানকালে হজ ও উমরার নিয়াত করবে।

তাই জিদ্দাবাসী ছাড়া যে কেউ জিদ্দা থেকে ইহরাম বাঁধলো সে হজের একটি ওয়াজিব পরিত্যাগ করলো। তা হলো মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। এর কারণে তার ওপর একটি ফিদইয়া অপরিহার্য হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি বিনা ইহরামে মীকাত অতিক্রম করবে তার কর্তব্য হবে মীকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে আসা। সে যদি তথায় ফিরে না যায় বরং যে স্থানে পৌঁছেছে সে স্থান থেকেই ইহরাম বেঁধে নেয়, তবে তার ওপরও একটি ফিদইয়া প্রদান করা অপরিহার্য হবে। আর তা হলো একটি ছাগল যবেহ করা, বা উট ও গরুর এক সপ্তাংশে অংশীদার হয়ে যবেহ করা আর তা হারামের মিসকীনদের মাঝে বিতরণ করা, তা থেকে কিছু ভক্ষণ না করা।

হজ আদায়ের পদ্ধতি: ইহরাম বাঁধার পূর্বে গোসল করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে, চুলের যা কর্তন করা বৈধ তা কর্তন করে শরীরে সুগন্ধি লাগিয়ে ইহরামের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া মুস্তাহাব। পুরুষলোক সিলাইযুক্ত কাপড় খুলে ফেলবে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন সাদা দু’টি-লুঙ্গী ও চাদর পরিধান করবে। বিশুদ্ধ মতে ইহরামের জন্য কোনো বিশেষ সালাত নেই, তবে ইহরাম বাঁধাটা যদি কোনো ফরয সালাতের সময়ে হয়, তবে ফরয সালাতের পর ইহরাম বাঁধবে, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয সালাতের পর ইহরাম বেঁধেছিলেন।

অতঃপর তিন প্রকার হজ: তামাত্তু‘, ক্বিরান, ইফরাদ যেটার ইচ্ছা করবে সেটার ইহরাম বাঁধবে।

তামাত্তু হজের সংজ্ঞা: হজের মাসে উমরার ইহরাম বেঁধে তা পুরা করে ঐ সফরেই হজের ইহরাম বাঁধা হলো তামাত্তু‘ হজ।

ক্বিরান হজের সংজ্ঞা: হজ ও উমরার এক সাথে ইহরাম বাঁধা, অথবা প্রথমে উমরার ইহরাম বাঁধা, পরে উমরার তাওয়াফ শুরু করার আগেই হজকে উমরার সাথে জড়িত করে নেওয়াই ক্বিরান হজ। অতঃপর মীকাত থেকে হজ ও উমরা উভয়ের নিয়াত করবে বা উমরার তাওয়াফ শুরু করার আগেই হজ ও উমরা উভয়ের নিয়াত করবে। তারপর হজ ও উমরা উভয়ের তাওয়াফ ও সা‘ঈ করবে।

ইফরাদ হজের সংজ্ঞা: মীকাত থেকে শুধু হজের ইহরাম বাঁধা ও হজের সকল কর্ম সম্পাদন করা পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকা হলো ইফরাদ হজ।

মাসজিদে হারামের অধিবাসী নয় এমন-তামাত্তু‘ ও ক্বিরানকারীর ওপর হাদি যবাই করা অপরিহার্য। তিন প্রকার হজের কোনোটি উত্তম এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে ফকীহগণের মধ্যে কিছু কিছু বড় মুহাক্কিকের নিকট তামাত্তু‘ হজ উত্তম।

তারপর যখন এ তিন প্রকার হজের যে কোনো একটি হজের ইহরাম বাঁধবে, তখন ইহরামের পর লাব্বাইক বলবে,

«لبيك اللهم لبيك، لبيك لا شريك لك لبيك، إن الحمد والنعمة لك والملك لا شريك لك».

উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা-শারীকা লাকা।

তালবীয়াহ বেশি বেশি পাঠ করবে। পুরুষ লোক উচ্চ-শব্দে পাঠ করবে।

ইহরামের নিষিদ্ধ কর্মসমূহ:

আর তা হলো ইহরাম বাঁধার কারণে মুহরিম ব্যক্তির ওপর যা সম্পাদন করা হারাম, তা সর্বমোট নয়টি:

এক: চুল মুণ্ডানো বা অন্য কিছুর মাধ্যমে সমস্ত শরীর থেকে চুল উঠানো। কারণ, আল্লাহ তা‘আলার বাণী হলো,

﴿وَلَا تَحۡلِقُواْ رُءُوسَكُمۡ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ ٱلۡهَدۡيُ مَحِلَّهُۥ ١٩٦﴾ [البقرة: ١٩٦]

“যে পর্যন্ত কুরবানীর পশু উহার স্থানে না পৌঁছে তোমরা মাথা মুণ্ডন করিও না”। [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৯৬]

দুই: বিনা ওযরে নখ কাটা। কারণ, এর দ্বারা চাকচিক্য অর্জিত হয় তাই তা চুল উঠানোর সাদৃশ্যে পরিণত হয়। তবে ওযর থাকলে নখ কাটা জায়েয হবে। যেমন, ওযরের কারণে চুল হাল্কা করে কাটা বা মাথা মুণ্ডানো জায়েয।

তিন: মাথা ঢাকা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মুহরিমের মাথা ঢাকতে নিষেধ করেছেন যে মুহরিমকে তার উট পা দিয়ে পিষে দিয়েছিল, তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,

«ولا تخمر رأسه فإنه يبعث يوم القيامة ملبياً».

“তার মাথা ঢাকিও না। কারণ, কিয়ামাত দিবসে তাকে তালবীয়াহ পাঠ করা অবস্থায় উঠানো হবে”।[1]

আর ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলতেন,

«إحرام الرجل في رأسه وإحرام المرأة في وجهها».

“পুরুষের ইহরাম হলো তার মাথায়, আর মহিলাদের ইহরাম হলো তার চেহারায় বা মুখে”।[2]

চার: পুরুষের সিলাইযুক্ত কাপড় পরিধান করা ও মোজা পরিধান করা। কারণ, আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন,

«سئل رسول الله r ما يلبس المحرم؟ قال: لا يلبس المحرم القميص ولا العمامة ولا البرانس ولا السراويل ولا ثوباً مسّه ورس ولا زعفران، ولا الخفين إلا أن لا يجد نعلين فليقطعهما حتى يكونا أسفل من الكعبين».

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মুহরিম ব্যক্তি কী পোশাক পরিধান করবে? তিনি বললেন, মুহরিম ব্যক্তি কুর্তা, পাগড়ী, বুরনুস (এমন পোষাক যা সম্পূর্ণ মাথা আবৃত করে রাখে), পায়জামা পরিধান করবে না, ওয়ারস ও যাফরান যুক্ত কাপড়ও পরিধান করবে না, মোজাও পরিধান করবে না। তবে যদি সে জুতা না পায় তাহলে মোজা পায়ের গিরার উপরিভাগ কর্তন করে পরিধান করবে, যাতে মোজা পায়ের গিরার নিচে থাকে”।[3]

পাঁচ: সুগন্ধি ব্যবহার করা।

«لأن النبي r أمر رجلا في حديث صفوان بن أمية بغسل الطيب».

“কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ান ইবন ই‘লা ইবন উমাইয়াহ এর হাদীসে এক ব্যক্তিকে সুগন্ধি ধুয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন”।[1]

তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মুহরিম ব্যক্তির ব্যাপারে বলেছিলেন যাকে তার উট পা দিয়ে পিষে দিয়েছিল,

«لا تحنطوه».

“তোমরা তাকে সুগন্ধি লাগিও না”।[2]

সহীহ মুসলিমে আছে,

 «ولا تمسوه بطيب»

“তাকে সুগন্ধি দ্বারা স্পর্শ করিও না।”[3]

মুহরিমের জন্য তার ইহরাম বাঁধার পর শরীরে বা শরীরের কোনো অংশে সুগন্ধি লাগানো হারাম। পূর্ব বর্ণিত ইবন উমারের হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত হয়েছে।

ছয়: স্থলচর প্রাণী হত্যা করা। কারণ, আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে রয়েছে,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَقۡتُلُواْ ٱلصَّيۡدَ وَأَنتُمۡ حُرُمٞۚ ٩٥﴾ [المائ‍دة: ٩٥]

“হে মুমিনগণ! ইহরামে থাকাকালে তোমরা শিকার-জন্তু বধ করবে না”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৯৫]

আর তা শিকার করাও হারাম, যদিও তা হত্যা বা জখম না হয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলার বাণী রয়েছে:

﴿وَحُرِّمَ عَلَيۡكُمۡ صَيۡدُ ٱلۡبَرِّ مَا دُمۡتُمۡ حُرُمٗاۗ ٩٦﴾ [المائ‍دة: ٩٦]

“এবং তোমরা যতক্ষণ ইহরামে থাকবে ততক্ষণ স্থলের (কোনো প্রাণী) শিকার তোমাদের জন্য হারাম”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৯৬]

সাত: বিবাহ করা। মুহরিম নিজে বিবাহ করবে না ও নিজের অভিভাবকতায় ও প্রতিনিধিত্বে অপরকে বিবাহ করাবে না, কারণ উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর মারফু‘ হাদীসে এসেছে,

«لا ينكح المحرم ولا ينكح ولا يخطب».

“মুহরিম নিজে বিবাহ করবে না অপরকে বিবাহ করাবে না ও বিবাহের প্রস্তাবও দিবে না”।[4]

আট: লজ্জাস্থানে সহবাস করা। কারণ, আল্লাহর বাণী রয়েছে,

﴿فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ ١٩٧﴾ [البقرة: ١٩٧]

“অতঃপর যে কেউ এ মাসগুলিতে হজ করা স্থির করে সে যেন কোনো গর্হিতকাজ না করে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তা (রাফাস) হলো সহবাস করা। এর দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

﴿أُحِلَّ لَكُمۡ لَيۡلَةَ ٱلصِّيَامِ ٱلرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَآئِكُمۡۚ ١٨٧﴾ [البقرة: ١٨٧]

“সিয়ামের রাত্রে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সহবাস বৈধ করা হইয়াছে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭] উদ্দেশ্য হলো সহবাস করা।

নয়: যৌন আকর্ষণের সাথে নারীদের শরীরে শরীর লাগানো বা চুমু দেওয়া বা স্পর্শ করা। অনুরূপভাবে যৌন আকর্ষণের সাথে তাকানো। কারণ, তা হারাম সহবাসের দিকে পৌঁছে দেয়। সুতরাং তা হারাম।

এ নিষিদ্ধ কাজে মহিলারা পুরুষদের ন্যায়। তবে মহিলারা বিশেষ কিছু কর্মে পুরুষদের থেকে স্বতন্ত্র। যেমন, মহিলার ইহরাম হলো তার মুখে। তাই মহিলাদের জন্য বোরকা, নিকাব, বা অনুরূপ কিছুর দ্বারা তাদের মুখ ঢাকা হারাম।

মহিলাদের জন্য হাত মোজা পরিধান করাও হারাম। কারণ, ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মারফু‘ হাদীসে এসেছে,

«ولا تنتقب المرأة المحرم ولا تلبس القفازين».

“মুহরিম মেয়েরা নিকাব পরিধান করবে না, হাত মোজাও পরিধান করবে না”।[1]

অনুরূপভাবে ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,

«إحرام المرأة في وجهها».

“মহিলার ইহরাম হলো তার মুখে”।[2]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,

«كان الركبان يمرون بنا ونحن مع رسول الله r محرمات، فإذا حاذوا بنا سدلت إحدانا جلبابها من رأسها على وجهها، فإذا جاوزنا كشفناه».

“যখন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহিত বিদায় হজে হজযাত্রী ছিলাম তখন আমাদের পাশ দিয়ে কাফেলা অতিক্রম করতো। যখন কাফেলার লোকজন আমাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করতো তখন আমরা মাথা থেকে চাদর চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিতাম। আর যখন তারা আমাদেরকে অতিক্রম করে চলে যেত তখন আমরা মুখের উপর থেকে কাপড় তুলে দিতাম”।[3]

পুরুষের জন্য যেমন চুল উঠানো, নখ কাটা, জানোয়ার হত্যা করা ইত্যাদি হারাম তা মহিলাদের জন্যও হারাম, কারণ তারা সাধারণ ব্যাপক নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। তবে তারা সেলাইযুক্ত কাপড়, পায়ে মোজা পরিধান করতে পারবে ও তারা মাথা ঢাকতে পারবে।

দ্বিতীয় রুকন: ‘আরাফায় অবস্থান। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«الحج عرفة».

“আরাফার অবস্থানই হজ”।[4]

তৃতীয় রুকন: তাওয়াফুল ইফাযা। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩﴾ [الحج : ٢٩]

“এবং তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের”। [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ২৯]

চতুর্থ রুকন: সা‘ঈ করা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«اسعوا فإن الله كتب عليكم السعي».

“তোমরা সা‘ঈ কর, কারণ, আল্লাহ তোমাদের ওপর সা‘ঈ লিখে দিয়েছেন”।[5]

৬- হজের ওয়াজিবসমূহ:

হজের সর্বমোট ওয়াজিব সাতটি:

(১) মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা।

(২) সূর্যাস্ত পর্যন্ত ‘আরাফায় অবস্থান করা, তা তাদের জন্য যারা দিনের বেলায় ‘আরাফায় অবস্থান করবে।

(৩) মুযদালিফায় রাত্রি যাপন।

(৪) আইয়্যামে তাশরীকের (১১, ১২ ও ১৩ই যুলহাজ্জাহর) রাত্রিগুলোতে মিনায় রাত্রি যাপন করা।

(৫) জামরাগুলোতে কঙ্কর মারা।

(৬) মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা।

(৭) তাওয়াফুল বি‘দা করা।

৭- হজের বর্ণনা:

হজ আদায়ের ইচ্ছা পোষণকারী ব্যক্তির জন্য ফরয গোসলের ন্যায় গোসল করা সুন্নাত। নিজ শরীরে যেমন তার মাথায় ও দাঁড়িতে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত। সাদা লুঙ্গি ও চাদর পরিধান করা সুন্নাত। মহিলা সৌন্দর্য প্রকাশ করে এমন পোষাক ছাড়া যে কোনো পোষাক পরিধান করতে পারবে।

তারপর মীকাতে পোঁছে (ইহরাম বাঁধার সময়) ফরয সালাতের সময় হলে তা আদায় করবে ও তারপর ইহরাম বাঁধবে। ইহরাম বাঁধার সময় ফরয সালাতের সময় না হলে দু’ রাকাত সালাত আদায় করবে, অযুর সুন্নাতের নিয়াতে ইহরামের সুন্নাতের নিয়াতে নয়। ইহরামের জন্য সুন্নাত সালাত রয়েছে একথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণ হয় নি। আর যখন সালাত শেষ হয়ে যাবে তখন হজে প্রবেশের নিয়াত করবে। সুতরাং তামাত্তু‘ হজকারী হলে বলবে,

«لبيك اللهم عمرة»

(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা উমরাতান)।

আর হজে ইফরাদকারী বলবে,

«لبيك اللهم حجاً»

(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা হাজ্জান)।

আর হজে ক্বিরানকারী বলবে,

«لبيك اللهم حجاً في عمرة»

(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা হাজ্জান ফি উমরাতিন)। পুরুষ ব্যক্তি জোরে বলবে মহিলারা চুপে চুপে বলবে আর বেশি বেশি তালবীয়াহ পাঠ করবে। যখন মক্কায় পৌঁছবে তখন তাওয়াফ শুরু করবে, হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করবে। আল্লাহর ঘরকে তার বাম দিকে রাখবে। হাজারে আসওয়াদকে লক্ষ্য করবে। তাকে চুমু দিবে বা তাকে স্পর্শ করবে বিনা ভিড়ে যদি সম্ভব হয় তবে তাকে ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করবে। অন্যথায় তার দিকে ইশারা করবে ও তাকবীর দিবে অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলবে আর বলবে,

«اللهم ايماناً بك وتصديقاً بكتابك ووفاء بعهدك واتباعاً لسنة نبيك r،».

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ঈমানান বিকা ওয়া তাসদীকান বিকিতাবিকা ওয়া ওয়াফাআন বিআহদিকা ইত্তেবাআন লিসুন্নাতে নবীইয়েকা।

অর্থাৎ “হে আল্লাহ, আপনার ওপর ঈমান এনে, আপনার কিতাবের ওপর বিশ্বাস করে, আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণার্থে এবং আপনার নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের আনুগত্য করতে গিয়ে আমি তা শুরু করছি”।

আর সাত চক্কর তাওয়াফ করবে। আর যখন রুকনে ইয়ামানীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে তখন তাকে চুমু ছাড়াই হাত দিয়ে স্পর্শ করবে।

রামল করা তাওয়াফের সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর রামল হলো, তাওয়াফে কুদূমের প্রথম তিন শাওত্বে বা প্রথম তিন চক্করে ঘন ঘন পা রেখে দ্রুত চলা।

কারণ, ইবন উমার থেকে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন প্রথম তাওয়াফ করতেন তখন প্রথম তিন চক্করে দ্রুত চলতেন আর বাকী চার চক্করে সাধারণভাবে চলতেন।

ইযতিবা করাও তাওয়াফের সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। ইযতিবা হলো, ইহরাম অবস্থায় পরিহিত চাদরের মধ্য ভাগকে ডান কাঁধের নিচ দিয়ে চাদরের উভয় কোণ বাম কাঁধের ওপর ধারণ করা। কারণ, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,

«اضطبع رسول الله r هو وأصحابه ورملوا ثلاثة أشواط».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ও তাঁর সাহাবীগণ ইযতিবা করেছেন ও তিন চক্করে রামল করেছেন।

আর ইযতিবা শুধুমাত্র সাত চক্কর তাওয়াফে সুন্নাত। এর আগে বা পরে সুন্নাত নয়।

বিনয়ের সাথে ও আন্তরিকভাবে নিজের নিকট যে সকল দো‘আ পছন্দনীয় সে সকল দো‘আ তাওয়াফ করার সময়ে পড়বে।

রুকনে ইয়ামানী ও হাজারে আসওয়াদের মাঝখানে বলবে,

﴿رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِي ٱلدُّنۡيَا حَسَنَةٗ وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِ حَسَنَةٗ وَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ ٢٠١﴾ [البقرة: ٢٠١]

উচ্চারণ: রাব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতে হাসানাতাও ওয়াক্বিনা আযাবান নার।

“হে আমাদের রব! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দাও এবং পরকালেও কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে অগ্নি-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০১]

প্রতি চক্করে নির্ধারিত দো‘আর প্রচলন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, বরং তা বিদ‘আত, ইসলামে নতুন কাজ।

আর তাওয়াফ তিন প্রকার: তাওয়াফে ইফাযাহ, তাওয়াফে কুদূম ও তাওয়াফে বিদা‘। প্রথমটি রুকন, দ্বিতীয়টি সুন্নাত এবং তৃতীয়টি বিশুদ্ধমতে ওয়াজিব।

তাওয়াফ শেষান্তে মাক্বামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাকাত সালাত পড়বে। মাক্বামে ইবরাহীম থেকে দূরে পড়লেও কোনো অসুবিধা নেই। প্রথম রাকাতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা আল-ক্বাফিরুন

﴿ قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡكَٰفِرُونَ ١﴾ [الكافرون: ١]

এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা ইখ্লাস

﴿ قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١﴾ [الاخلاص: ١]

পড়বে। এ দু’ রাকাত সালাত হালকা হওয়া সুন্নাত। হাদীসে এভাবেই এসেছে। তারপর সাফা ও মারওয়াতে সাত চক্কর সা‘ঈ করবে। আর সা‘ঈ সাফা থেকে শুরু হবে, মারওয়াতে শেষ হবে। সাফা পাহাড়ে উঠতে নিম্নের আয়াত পাঠ করা সুন্নাত।

﴿إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّهِۖ فَمَنۡ حَجَّ ٱلۡبَيۡتَ أَوِ ٱعۡتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَاۚ وَمَن تَطَوَّعَ خَيۡرٗا فَإِنَّ ٱللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ ١٥٨﴾ [البقرة: ١٥٨]

উচ্চারণ: ইন্নাস্ সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ ফামান্ হা্জ্জাল বাইতা আবি‘তামারা ফালা জুনাহা আলাইহি আই-ইয়াত্তাওফা বিহিমা ওয়ামান তা-তাওয়া‘ খাইরান ফাইন্নাল্লাহা শা-কিরুন আলীম।

“সাফা ও মারওয়া, আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে কেউ কা‘বা গৃহের হজ কিংবা উমরাহ সম্পন্ন করে তার জন্যে এ দুইটির তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করলে তার কোনো পাপ নেই, এবং কেউ স্বেচ্ছায় সৎকাজ করলে আল্লাহ গুণগ্রাহী সর্বজ্ঞ”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৫৮]

أبدأ بما بدأ الله به

‘‘আল্লাহ যা দ্বারা শুরু করেছেন, আমিও তা দ্বারা শুরু করলাম’’।

তারপর সাফা পর্বতে উঠবে। হস্তদ্বয় উত্তোলন করে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহর একত্বতা বর্ণনা করবে, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করবে, তাঁর প্রশংসা করবে ও বলবে,

«الله أكبر، الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد يحي ويميت وهو على كل شيء قدير، لا إله إلا الله وحده أنجز وعده ونصر عبده وهزم الأحزاب وحده».

উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওলাহুল হামদু ইউহ্য়ী ওয়ায়ামুতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়ীন ক্বাদীর। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, আন্জাযা ওআ‘দাহু ওয়ানাসারা আবদাহু, ওয়াহাযামা আল-আহযাবা ওয়াহদাহু।

তারপর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধনের জন্য দো‘আ করবে। আর এ দো‘আ তিনবার করে পাঠ করবে। তারপর মারওয়ার দিকে যাবে, দুই সবুজ চিহ্নের মাঝে পুরুষের জন্য সম্ভব হলে দ্রুত চলা সুন্নাত। তবে কাউকে কষ্ট দিবে না। মারওয়াতে পৌঁছে তার ওপর উঠবে, ক্বিবলামুখী হবে, তারপর হস্তদ্বয় উত্তোলন করে, সাফাতে যা পাঠ করেছিল অনুরূপ মারওয়াতে তাই পাঠ করবে। সা‘ঈ করাকালীন নিম্নের দো‘আটি পাঠ করা উত্তম।

«رب اغفر وارحم إنك أنت الأعز الأكرم»

উচ্চারণ: রাব্বিগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ‘য়ায্যুল আক্রাম।

কারণ, ইবন উমার ও ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সা‘ঈতে এ দো‘আটি পড়তেন। অযু অবস্থায় সা‘ঈ করা মুস্তাহাব, কেউ যদি বিনা অযুতে সা‘ঈ করে নেয়, তবে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। ঋতুবর্তী মহিলা যদি সা‘ঈ করে নেয়, তবে তাও তার জন্য যথেষ্ট হবে। কারণ, সা‘ঈতে অযু শর্ত নয়।

আর সে তামাত্তু‘ হজকারী হলে সম্পূর্ণ মাথার চুল ছোট করবে। মহিলা তার চুল থেকে এক আঙ্গুলের মাথার পরিমাণ ছোট করবে।

আর যদি সে ক্বিরান বা ইফরাদ হজকারী হয় তবে সে (ইয়াওমুন নাহার)-কুরবানীর দিন যুলহাজ মাসের দশ তারিখে জামারাতুল আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করে হালাল হওয়া পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকবে।

যুলহাজ মাসের আট তারিখে ‘‘তারবীয়ার দিবসে’’ সূর্য উদয়ের কিছু পরে তামাত্তু‘ হজকারী নিজ বাসস্থান থেকে ইহরাম বাঁধবে। মাক্কাবাসীদের যে ব্যক্তি হজ করতে ইচ্ছা করবে সেও অনুরূপ করবে।

ইহরাম বাঁধা সময়ে গোসল করবে, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হবে ও অন্যান্য কাজ করবে। ইহরাম বাঁধার জন্য মাসজিদে হারামে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয় নি। আমাদের জানা মতে তিনি তাঁর কোনো সাহাবীকে এর আদেশও দেন নি।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে বললেন,

«أقيموا حلالاً حتى إذا كان يوم التروية فأهلوا بالحج».

“তোমরা হালাল অবস্থায় থাক। তারপর তারবীয়ার দিবসে হজের ইহরাম বাঁধ।”

সহীহ মুসলিমে জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أمرنا رسول الله r لما أهللنا أن نحرم إذا توجهنا إلى منى فأهللنا من الأبطح»

“যখন আমরা মিনার দিকে রওনা হলাম তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ইহরাম বাঁধার আদেশ দিলেন, তখন আমরা আল-আবত্বাহ নামক স্থান থেকে ইহরাম বাঁধলাম।

তামাত্তু‘ হজকারী তার হজের ইহরাম বাঁধার সময় «لبيك حجاً» ‘লাব্বাইক হাজ্জান’ বলবে।

আর মুস্তাহাব হচ্ছে, মিনার দিকে বের হয়ে যাওয়া ও সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সালাত পৃথক পৃথকভাবে স্ব স্ব ওয়াক্তে কসর করে আদায় করা। তথায় আরাফার রাত্রি যাপন করাও তার জন্য মুস্তাহাব।

কারণ, তা সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে আছে।

তারপর আরাফার দিবসের (যুলহাজ মাসের নয় তারিখের) সূর্য উদিত হলে আরাফায় যাবে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সম্ভব হলে নামেরায় অবস্থান করা তার জন্য মুস্তাহাব। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেছেন। আর কারো জন্য যদি নামেরায় অবস্থান সম্ভব না হয় আর সে ‘আরাফায় অবস্থান করে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পর যোহর, আসরের সালাত এক আযান দু’ ইকামাতে একত্রিতভাবে দু’রাকা‘আত দু’ রাকাত করে পড়বে। তারপর মাওকিফ-‘আরাফা অর্থাৎ ‘আরাফার অবস্থানস্থলে অবস্থান করবে। সম্ভব হলে জাবালে রাহমাতকে তার ও ক্বিবলার মাঝে রাখা উত্তম। অন্যথায় পাহাড়মুখী না হলেও ক্বিবলামুখী হবে হস্তদ্বয় উত্তোলন অবস্থায় আল্লাহর যিকিরে, বিনয়তা প্রকাশে, দো‘আয় ও কুরআন তিলাওয়াতে পুরোপুরিভাবে ব্যস্ত থাকা মুস্তাহাব।

কারণ উসামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে আছে, তিনি বলেন,

«كنت رديف النبي r بعرفات فرفع يديه يدعو فمالت به ناقته فسقط خطامها فتناول خطامها بإحدى يديه وهو رافع يده الأخرى».

“আমি ‘আরাফার মাঠে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে এক সাওয়ারীতে ছিলাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তদ্বয় উত্তোলন করে দো‘আ করতে লাগলেন, তাঁর উটনি তাঁকে নিয়ে একটু কাত হয়ে গেল ও তার লাগাম পড়ে গেল, তারপর তাঁর এক হাত দিয়ে তা উঠিয়ে নিলেন আর তাঁর অপর হাতটি উত্তোলন অবস্থায় ছিল”।[1]

আর সহীহ মুসলিমে আছে,

«لم يزل واقفاً يدعو حتى غابت الشمس وذهبت الصفرة»

“সূর্য অস্তমিত হওয়া ও পশ্চিম আকাশে হলোদে রং দূরিভুত হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দো‘আ করছিলেন।

আরাফা দিবসের দোআ সর্বোত্তম দোআ। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«خير الدعاء دعاء يوم عرفة، وخير ما قلت أنا والنبيون من قبلي: لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير».

“সর্বোত্তম দো‘আ হলো আরাফা দিবসের দো‘আ। আমি ও আমার পূর্বের নবীগণের পঠিত উত্তম দো‘আ হলো,

«لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير»

উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল্ মু্ল্কু ওয়ালাহুল্ হাম্দু ওয়াহুয়া আলা-কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

“একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত হক্ব কোনো মা‘বুদ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, তাঁর জন্যই সকল রাজত্ব, তাঁর জন্যই সকল হামদ, আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান”।[2]

আর এ দো‘আতে আল্লাহর নিকট তার অভাব, প্রয়োজন ও বিনয়তা প্রকাশ করা তার ওপর অপরিহার্য।

আর সে এ সূবর্ণ সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট করবে না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«ما من يوم أكثر من أن يعتق الله فيه عبداً من النار من يوم عرفة، وإنه ليدنو ثم يباهي بهم الملائكة، فيقول: ما أراد هؤلاء».

“আল্লাহ তা‘আলা আরাফার দিবসে সব চেয়ে বেশি তাঁর বাঁন্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন, তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে তাদেরকে নিয়ে ফিরিশ্তাদের সাথে গর্ব করেন ও বলেন, তারা কি চায়?”[3]

আর ‘আরাফায় অবস্থান হওয়া হজের রুকন। সূর্য ডুবা পর্যন্ত অবস্থান করা ওয়াজিব। হাজী সাহেবদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে, নিশ্চিতভাবে ‘আরাফার সীমান্তের ভিতর অবস্থান করা। কারণ, অনেক হাজী সাহেবরা এর প্রতি গুরুত্ব দেন না, ফলে তারা ‘আরাফা সীমান্তের বাইরে অবস্থান করেন। তাই তাদের হজ হয় না। সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ধীর-স্থির ও শান্তিপূর্ণভাবে মুযদালিফার দিকে রওনা হবে।

কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أيها الناس السكينة السكينة».

“হে লোকসকল! তোমরা ধীর-স্থিরতা গ্রহণ কর, তোমরা ধীর-স্থিরতা গ্রহণ কর”।[4]

তারপর তথায় পৌঁছার পর মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করবে। মাগরিবের তিন রাকাত সালাত পড়বে আর ঈশার দু’ রাকাত সালাত পড়বে জম‘য়ে তা‘খীর (দেরী করে দু’ সালাত একত্রিত) করে।

হাজীদের জন্য মুযদালিফায় মাগরিব ও ঈশার সালাত একত্রে আদায় করা সুন্নাত। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মাগরিব ও ইশার সালাত পড়েছেন। আর যদি ঈশার সালাতের সময় চলে যাওয়ার আশংকা করে তবে তা যে কোনো স্থানে পড়ে নিবে।

আর মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করবে। সালাত ও অন্য কোনো ইবাদাত করে রাত্রি কাটাবে না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেন নি। ইমাম মুসলিম রহ. জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন,

«أن النبي r أتى المزدلفة فصلى بها المغرب والعشاء بأذان واحد وأتى المزدلفة فصلى بها المغرب والعشاء بأذان واحد وإقامتين ولم يسبح بينهما شيئاً ثم اضطجع حتى طلع الفجر»

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় পৌঁছলেন এবং সেখানে মাগরিব ও ইশার সালাত এক আযান দু’ ইকামতে আদায় করলেন, এ দু’য়ের মাঝে কোনো সুন্নাত পড়েন নি। তারপর ফজর হওয়া পর্যন্ত শুয়ে থেকেছেন”।

জামরাতুল ‘আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার জন্য অর্ধ রাত্রি ও চন্দ্র ডুবে যাওয়ার পর ওযরগ্রস্ত ও দুর্বল ব্যক্তির জন্য মুযদালিফা থেকে মিনায় যাওয়া জায়েয আছে। আর যারা দুর্বল নয় ও দুর্বলের সহযোগিতাতেও নয় এমন ব্যক্তিরা ফজর হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করতে থাকবে। আরাম করার জন্য প্রথম রাত্রে কঙ্কর নিক্ষেপ করার প্রতিযোগিতা যা আজকাল অধিকাংশ মানুষ করে থাকে, তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের পরিপন্থী।

হাজী সাহেব মুযদালিফায় ফজর সালাত পড়ে আল-মাশ‘আরুল হারামে অবস্থান করবে। কিবলামুখী হয়ে হস্তদ্বয় উত্তোলন করে পূর্বাকাশ পুরোপুরি ফর্শা হওয়া পর্যন্ত বেশি বেশি আল্লাহকে আহ্বান করবে।

মুযদালিফার যে কোনো স্থানে অবস্থান করলেই তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী রয়েছে,

«وقفت ها هنا وجمع كلها موقف» [رواه مسلم] و«جمع» هي مزدلفة.

“আমি এখানে অবস্থান করলাম, তবে জাম‘ তথা মুযদালিফা সম্পূর্ণটাই অবস্থান স্থল। এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। আর হাদীসে বর্ণিত ‘জাম‘ অর্থ মুযদালিফা”।

তারপর হাজী সাহেব কুরবানীর দিবসে সূর্য উদিত হওয়ার আগেই মিনায় চলে আসবে ও জামরাতুল ‘আকাবায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। জামরাতুল ‘আকাবা হলো বড় জামরা যা মক্কার নিকটবর্তী। আর প্রতিটি কঙ্কর ছোলা বুটের চেয়ে একটু বড় হতে হবে। চতুর্দিক থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা জায়েয হওয়ার ওপর সকল আলিমগণ একমত হয়েছেন। তবে কা‘বাকে তার বাম পাশে আর মিনাকে তার ডান পাশে রেখে কঙ্কর নিক্ষেপ করা উত্তম। কারণ, ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে আছে,

«أنه انتهى إلى الجمرة الكبرى فجعل البيت عن يساره ومنى عن يمينه ورمى بسبع، وقال: هكذا رمى الذي أنزل عليه سورة البقرة».

“তিনি যখন বড় জামরার নিকটে পৌঁছলেন, তখন কা‘বাকে তাঁর বাম পাশে আর মিনাকে তাঁর ডান পাশে রাখলেন ও সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, যার ওপর সূরা আল-বাকারাহ অবতীর্ণ হয়েছিল তিনি এভাবে কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন”।[5]

বড় কঙ্কর, মোজা ও জুতা নিক্ষেপ করা জায়েয নয়। হাজী সাহেব জামরাতুল আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার সময় তালবীয়াহ পাঠ ছেড়ে দিবে।

হাজী সাহেবদের জন্য সুন্নাত হচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে আগে কঙ্কর মারা, তারপর সে তামাত্তু‘ বা কিরান হজকারী হলে হাদি জবেহ করা, তারপর চুল কামিয়ে ফেলা বা চুল ছোট করা। তবে পুরুষের জন্য চুল কামিয়ে ফেলা উত্তম। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য তিনবার রাহমাত ও মাগফিরাতের দো‘আ করেছেন। আর চুল ছোটকারীদের জন্য মাত্র একবার দো‘আ করেছেন। যেমন, এ হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। তারপর হাজী সাহেব তাওয়াফে ইফাদাহ বা হজের বড় তাওয়াফ করার জন্য বাইতুল্লাহতে যাবেন।

আর এটাই জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে সুন্নাত হিসাবে বর্ণিত হয়েছে, হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন। তাতে এসেছে,

«أن النبي r أتى الجمرة التي عند الشجرة فرماها بسبع حصيات يكبر مع كل حصاة منها، مثل حصي الحذف، رمى من بطن الوادي ثم انصرف إلى المنحر فنحر ثم ركب رسول الله r فأفاض إلى البيت فصلى بمكة الظهر»

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জামরাটি গাছের নিকটে ছিল তার কাছে আসলেন ও তাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন আর প্রত্যেক কঙ্কর নিক্ষেপকালে ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বললেন। কঙ্কর ছেলেদের ব্যবহৃত গুলালের গুলির মত-বা সমান হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাত্বনুল ওয়াদী থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন। তারপর মিনায় গেলেন ও উটের নাহর করলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ারীতে আরোহণ করে মক্কায় এসে বায়তুল্লাহ শরীফে এসে পৌঁছালেন ও সেখানে যোহরের সালাত আদায় করলেন”।

কোনো হাজী সাহেব যদি এ চারটি ইবাদাতের কোনো একটি ইবাদাতকে অন্য কোনো একটি ইবাদাতের আগে করে ফেলে তাতে তার ওপর কোনো দোষ বর্তাবে না। কারণ, বিদায় হজের ব্যাপারে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীস যা বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে,

«وقف رسول الله r والناس يسألونه، قال: فما سئل رسول الله r يومئذ عن شيء قدم أو أخر إلا قال: افعل ولا حرج»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ছিলেন, এমতাবস্থায় যে মানুষেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেদিন কোনো কিছুকে আগে করে ফেলেছে বা পরে নিয়ে গেছে এমন সব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি শুধু বলতেন, কর, কোনো ক্ষতি নেই”।

হাজী সাহেব যদি তামাত্তু‘ হজকারী হন তাহলে তাওয়াফে ইফাদার পর সা‘ঈ করবেন। কারণ, তার প্রথম সা‘ঈ উমরার জন্য ছিল। সুতরাং তার ওপর হজের সা‘ঈ অপরিহার্য হবে। আর যদি সে ইফরাদ বা কিরান হজকারী হন ও তাওয়াফে কুদূমের পর সা‘ঈ করে নেন তাহলে দ্বিতীয় বার আর সা‘ঈ করবেন না। কারণ, জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে আছে,

«لم يطف النبي r ولا أصحابه بين الصفا والمروة إلا طوافاً واحداً طوافه الأول».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম সাফা ও মারওয়াতে একবার সা‘ঈ করেছেন প্রথম সা‘ঈ”।[1]

যারা মিনায় অবস্থানের ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করবে না তাদের জন্য আইয়্যামুত তাশরীক যুলহাজ মাসের (এগার, বার ও তের) তারিখ কঙ্কর মারার দিন ধরা হবে। আর যারা তাড়াতাড়ী করবেন তারা দু’ দিন যুলহাজ মাসের এগার ও বার তারিখ কঙ্কর মারবেন। কারণ, আল্লাহ তা‘আলার বাণী রয়েছে”

﴿وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡدُودَٰتٖۚ فَمَن تَعَجَّلَ فِي يَوۡمَيۡنِ فَلَآ إِثۡمَ عَلَيۡهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلَآ إِثۡمَ عَلَيۡهِۖ لِمَنِ ٱتَّقَىٰۗ ٢٠٣﴾ [البقرة: ٢٠٣]

“তোমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনগুলিতে আল্লাহকে স্মরণ করবে। যদি কেউ তাড়াতাড়ী করে দু’ দিনে চলে আসে তবে তার কোনো পাপ নেই, আর যদি কেউ বিলম্ব করে তবে তারও কোনো পাপ নেই। তা তার জন্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০৩]

১১ ও ১২ তারিখ হাজীসাহেব প্রথম জামরা (ছোট) যা মসজিদে খাইফের নিকটে তাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। তারপর মধ্যে জামরাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। তারপর জামরাতুল আকাবাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপ কালে ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলবে। (ছোট) জামরাকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে ক্বিবলামুখী হয়ে দাড়িয়ে, জামরাকে বাম পাশে রেখে অনেকক্ষণ ধরে লম্বা দো‘আ করা সুন্নাত। দ্বিতীয় জামরাতেও কঙ্কর মেরে ক্বিবলামুখী হয়ে দাড়ানো ও জামরাকে ব্যক্তির ডান পাশে রেখে লম্বা দো‘আ করা সুন্নাত। কিন্তু বড় জামরাতে কঙ্কর মারার পর লম্বা দো‘আ করা কিংবা দাঁড়ানো সুন্নাত নয়।

১১ ও ১২ তারিখ কঙ্কর মারার সময় শুরু হবে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পর। কারণ, ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে আছে। তিনি বলেন,

«كنا نتحيّن فإذا زالت الشمس رمينا».

“আমরা সময় দেখতে থাকতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখন আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম”।[2]

যুলহাজ মাসের তের তারিখের সূর্য ডুবার সাথে সাথে আইয়্যামুত তাশরীকের কঙ্কর মারার সময় শেষ হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি যুলহাজ্জ মাসের তের তারিখের সূর্য ডুবে গেল অথচ সে কঙ্কর মারতে পারলো না এর পর সে আর কঙ্কর মারবে না। তার ওপর দাম-ফিদয়া অপরিহার্য হবে।

হাজী সাহেব আইয়্যামে তাশরীকের যুলহাজ মাসের এগার ও বার তারিখের রাত্রিগুলো মিনায় যাপন করবে আর যে হাজী সাহেবের বার তারিখের সূর্য ডুবে গেল অথচ সে মিনা থেকে বের হতে পারলো না তার ওপর মিনায় রাত্রি যাপন এবং তের তারিখের কঙ্কর মারা অপরিহার্য হবে।

হাজী সাহেব যদি মক্কা থেকে চলে যেতে চান তাহলে তাওয়াফে বি‘দা করে চলে যাবেন। কারণ, তা অধিকাংশ ফকীহের নিকট হজের ওয়াজিবসমূহের একটি ওয়াজিব। তবে তা ঋতুবর্তী মহিলা থেকে বাদ পড়ে যাবে। (অর্থাৎ তাকে তা করতে হবে না) কারণ, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার হাদীসে আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لا ينفرّنّ أحد حتى يكون آخر عهده بالبيت، وفي رواية: إلا أنه خفف عن المرأة الحائض».

“কেউই (মক্কা হতে) চলে যাবে না যতক্ষণ না তার সর্বশেষ সময়টুকু আল্লাহর ঘরের কাছে কাটবে। (অর্থাৎ বিদায় তাওয়াফ না করে কেউই মক্কা ত্যাগ করবে না) অন্য বর্ণনায় আছে: ঋতুবর্তী মহিলার জন্য তাওয়াফে বিদা‘ না করেই চলে যাওয়া অনুমতি রয়েছে”।[3]

যে ব্যক্তি তাওয়াফে ইফাদাহ তার ভ্রমণ কাল পর্যন্ত পিছাবে তার জন্য তাওয়াফে ইফাদাই তাওয়াফে বিদা‘ হিসাবে অধিকাংশ ফকীহগণের নিকট যথেষ্ট হবে।

যে দো‘আটি বুখারী ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন সেই দো‘আটি হজ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তির জন্য পড়া মুস্তাহাব। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধ থেকে বা হজ অথবা উমরা থেকে ফিরতেন তখন প্রত্যেক উঁচু জায়গায় ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলতেন। অতঃপর নিম্নের দো‘আটি পড়তেন:

«لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك، وله الحمد، وهو على كل شيء قدير، آيبون تائبون عابدون لربنا حامدون، صدق الله وعده، ونصر عبده، وهزم الأحزاب وحده».

উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল্ মূল্কু ওয়ালাহুল্ হামদু ওয়াহুয়া আলা-কুল্লি শাইয়ীন ক্বাদীর। আ-য়েবূনা তায়েবূনা আ‘বেদূনা লিরাব্বেনা হা-মেদূন, সাদাক্বাল্লাহু ওয়া‘দাহু ওয়া নাসারা ‘আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।

সমাপ্ত

ইতিহাস কাণ্ডের এক মৌল মেরুদণ্ডের নাম ইসলাম। ইতিহাসের বিচিত্র অধ্যায় ও পর্যায় পেরিয়ে ইসলাম আজ এ পর্যায়ে আসীন। তাকে জানতে হলে, বুঝতে হলে, নির্ণয় করতে হবে তার মৌলিকত্ব, বিধিবিধান, বিশ্বাস, আচরণকে। বইটি তারই সংক্ষিপ্ত অর্থময় ও খুবই প্রাঞ্জল প্রয়াস।


[1] এ হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[2] হাদীসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন।

[3] হাদীসটি মালেক বর্ণনা করেছেন। আর মূল হাদীসটি সহীহ মুসলিমে আছে।


[1] হাদীসটি নাসাঈ বর্ণনা করেছেন।

[2] হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[3] হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[4] হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[5] বুখারী ও মুসলিম উভয়েই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।


[1] হাদীসটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।

[2] হাদীসটি বাইহাকী উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।

[3] এ হাদীসটি আবু দাউদ, ইবন মাজাহ ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন, হাদীসটির সনদ হাসান।

[4] হাদীসটি আহমাদ ও আসহাবুস সুনান বর্ণনা করেছেন।

[5] হাদীসটি ইমাম আহমাদ ও বাইহাকী বর্ণনা করেছেন্


[1] এ হাদীস বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[2] হাদীসটি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বরাতে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

[3] সহীহ মুসলিম।

[4] এ হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।


[1] এ হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বরাতে বর্ণনা করেছেন।

[2] ইমাম বাইহাকী এ হাদীসটি উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।

[3] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।


[1] সুনান নাসাঈ।

[2] এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ আবু দাউদ, ইবন মাজাহ ও বাইহাকী বর্ণনা করেছেন, ইমাম বাইহাকী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[3] সহীহ বুখারী ও মুসলিম, তবে শব্দগুলো সহীহ বুখারীর।

[4] হাদীসটি আবূ দাউদ, আহমাদ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, হাকেম হাদীসটি সহীহ বলেছেন।

[5] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

[6] সহীহ মুসলিম।


[1] বুখারী ও মুসলিম উভয়েই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

[2] হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন, হাসান ও সহীহ বলেছেন।

[3] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।


[1] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

[2] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।


[1] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

[2] সহীহ মুসলিম।