ড. আব্দুল কারীম যাইদান

অনুবাদক: মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

২৯. হুদুদ শব্দটি হদ এর বহুবচন। হদ এ আভিধানিক অর্থ বাধা দেওয়া, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করা المنع)) ইসলামী শরী‘আতের পরিভাষায়, অপরাধের যে সব শাস্তি শরী‘আত নির্ধারণ করে দিয়েছে সেসব শাস্তিকে হদ বলে। এ শাস্তি ধার্য করা আল্লাহর হক বা অধিকার (عقوبة مقدرة من قبل الشرع وجبت حقا لله تعالى)[1] কারণ জনগণের কল্যাণ সাধন ও দুর্ভোগ প্রতিহত করার লক্ষ্যে আল্লাহ এ শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। সুতরাং যেসব অপরাধের ক্ষতি ও বিপর্যয় জনগণের ওপর বর্তায় এবং অপরাধীর শাস্তির ফায়দা জনগণ ভোগ করে সেসব শাস্তি আল্লাহর হক হিসেবে বিবেচিত। জনগণের হককেই বলা হয়েছে আল্লাহর হক। এ শাস্তির সম্পর্ক আল্লাহর সাথে হওয়ায় এর গুরুত্ব যেমন অধিক, তেমন একে রহিত করার ক্ষমতা কারও নেই। কেউ রহিত করলেও এটা রহিত হয়ে যায় না। এ পরিভাষা অনুযায়ী কিসাস হদের আওতায় আসে না। যদিও তা শরী‘আতের পক্ষ থেকে নির্ধারিত। কারণ কিসাসের মধ্যে বান্দার হক থাকে প্রবল। অনুরূপ তা‘যীরও হদের মধ্যে গণ্য হয় না। কারণ তা‘যীরের শাস্তি শরী‘আতের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নয়। হদের উপরোক্ত পারিভাষিক অর্থ জমহুর ফকীহদের থেকে বর্ণিত। তবে কোনো কোনো ফকীহ হদের ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাদের মতে, শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তিকে হদ বলে (الحد هو العقوبة المقدرة شرعا)। এর সাথে আল্লাহর হক হিসেবে ধার্য হওয়ার কথা উল্লেখ নেই। তাদের এ সংজ্ঞা অনুযায়ী কিসাস ও দিয়াত হদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা উভয় শাস্তিই বান্দার হক হিসেবে শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত।

      জমহুরদের সংজ্ঞায় হুদুদ হলো:

هي العقوبة المقدرة من قبل الشرع لجرائم محدودة.

“শরী‘আত কর্তৃক সেসব শাস্তি যা কতগুলো নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য প্রবর্তিত।” অপরাধগুলো হচ্ছে, ব্যভিচার, ব্যভিচারের অপবাদ, মদ্যপান, চুরি, ডাকাতি (রাহাজানী), বিদ্রোহ ও ধর্মত্যাগ। এ সকল অপরাধের বিবরণ নিম্নরূপ:

এক. ব্যভিচারের শাস্তি

৩০. ব্যভিচারের শাস্তি জালদ, তাগরীব ও রজম। জালদ অর্থ বেত্রাঘাত করা, চাবুক মারা। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত থেকে এ শাস্তি প্রমাণিত।

﴿ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي ۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ﴾ [النور: ٢]

“ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর।” [সূরা আন-নূর: ২]

তাগরীব অর্থ নির্বাসন দেওয়া। হাদীস থেকে এ শাস্তি প্রমাণিত।। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«البكر بالبكر جلد مائة وتغريب عام».

“অবিবাহিত নারী ও পুরুষের মধ্যে ব্যভিচার হলে তার শাস্তি একশত বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন।”

তাগরীব দ্বারা উদ্দেশ্য ব্যভিচারী যে শহরে ব্যভিচার করে তাকে অন্য শহরে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা।

আর রজম অর্থ ব্যভিচারীকে প্রস্তর বা অনুরূপ বস্তু নিক্ষেপে হত্যা করা। রাসূলূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র কর্মনীতির মধ্যে এর প্রমাণ বিদ্যমান। মা‘য়িয ইবন মালিক আসলামীকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রজম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে গামিদ থেকে আগত নারীকেও তার নির্দেশে রজম করা হয়েছিল। এছাড়া রজমের বিধানের ওপর সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী মুসলিমদের ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত।

মুহসিন ব্যভিচারী ব্যতীত রজম ওয়াজিব হয় না। মুহসিন হওয়ার শর্ত কয়েকটি। তন্মধ্যে একটি হলো বৈধ স্ত্রীর সাথে সহবাস হওয়া। অর্থাৎ ব্যভিচারী বৈধভাবে বিবাহিত হবে, বৈধ স্ত্রীর সাথে সহবাস থাকতে হবে এবং সে বালেগ ও বিবেকবান হবে। মুহসিন না হলে তার শাস্তি একশ চাবুক ও এক বছরের নির্বাসন।

লিওয়াতাত বা সমমৈথুন: জমহুরদের মতে লিওয়াতাত ব্যভিচারের সম অর্থ হিসেবে গণ্য। সুতরাং ব্যভিচারের যে শাস্তি লিওয়াতাতেরও সেই একই শাস্তি। ইমাম আবু হানিফার মতে লিওয়াতাত ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার ওপরে হদও ওয়াজিব নয়; বরং এর শাস্তি তা‘যীর।[2] তবে জমহুরদের মতটি এখানে অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণ আছে, লিওয়াতাত কর্মে লিপ্ত উভয়কে হত্যা করার ব্যাপারে তারা একমত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من وجدتموه يعمل عمل قوم لوط فاقتلوا الفاعل والمفعول به»

“তোমরা যদি কাউকে কওমে লূতের ন্যায় কুকর্মে লিপ্ত দেখ তাহলে উভয়কে হত্যা কর।” পার্থক্য হলো, এ কুকর্মে জড়িতদের হত্যার বেলায় মুহসিন বা বিবাহিত হওয়ার শর্ত নেই। সুতরাং বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত উভয়ের শাস্তি হত্যা। কারণ হাদীসে তাদের হত্যার ব্যাপারে বিবাহের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় নি। এছাড়া সাহাবীদের থেকে বিবাহের শর্ত ছাড়াই তাদেরকে হত্যা করার কথা বর্ণিত হয়েছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, সমমৈথুনকে যদিও ব্যভিচারের পর্যায়ে গণ্য করা হয়, কিন্তু সর্বাবস্থায় হত্যাই এর একমাত্র শাস্তি।”[3]

দুই. কযফ (ব্যভিচারের অপবাদ)

৩২. قذف (কযফ) এর আভিধানিক অর্থ নিক্ষেপ করা নিক্ষেপ করা বা আরোপ করা। । শরী‘আতে কযফ অর্থ কারও প্রতি ব্যভিচারের দোষ আরোপ করা । অর্থাৎ নির্দিষ্ট কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে কোনো ব্যক্তিকে ব্যভিচারের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা। পবিত্র কুরআনে এরূপ অপবাদ দেওয়াকে হারাম এবং এর শাস্তি বেত্রাঘাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ ٱلۡمُحۡصَنَٰتِ ثُمَّ لَمۡ يَأۡتُواْ بِأَرۡبَعَةِ شُهَدَآءَ فَٱجۡلِدُوهُمۡ ثَمَٰنِينَ جَلۡدَةٗ وَلَا تَقۡبَلُواْ لَهُمۡ شَهَٰدَةً أَبَدٗاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤ إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ مِنۢ بَعۡدِ ذَٰلِكَ وَأَصۡلَحُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٥﴾ [النور: ٤،  ٥]

“যারা পবিত্রা সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে। অতঃপর স্বপক্ষে চারজন পুরুষ স্বাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই সত্যত্যাগী। কিন্তু এরপর যারা তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪-৫]

      কুরআন মাজীদে কেবল পবিত্রা নারীর ওপর মিথ্যা অপবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু এর হুকুম সৎ পুরুষদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য এবং এর ওপর উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত। মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার অপরাধে যাদের ওপর হদ কার্যকর করা হয়েছে আদালতে কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না। তবে সে যদি তওবা করে তাহলে ইমাম মালিক, ইমাম শাফে‘ঈ, ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. ও তাদের অনুসারীদের মতে তার সাক্ষ্য কবুল করা যাবে। ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, তওবা করলেও তার সাক্ষ্য কবুল করা হবে না।

৩৩. স্বামী যদি স্বীয় স্ত্রীর ওপর ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয় এবং স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে হদ দাবী করে তাহলে স্বামীকে লি‘আন করতে হবে। যেভাবে এর বর্ণনা কুরআন ও সুন্নায় এসেছে এবং ফকীহগণ যেভাবে এর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।

তিন.  মদ্যপান

৩৪. মদ : নেশা সৃষ্টিকারী যে কোনো জিনিসকে মদ বলে। তার মূল আংগুর হোক বা অন্য কিছু। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে বহু হাদীস ও উক্তি বর্ণিত আছে। যেমন, বলা হয়  كل مسكر حرام“নেশাজাত যে কোনো দ্রব্য হারাম।” সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত,

«ما أسكر كثيره فقليله حرام».

“যে দ্রব্য অধিক সেবনে নেশা হয় তার অল্পও হারাম।”

হাশীশ (এক ধরণের মাদকদ্রব্য) ও অনুরূপ যে সব জিনিসে নেশা উৎপন্ন হয় তা মদের মধ্যে গণ্য এবং সেবনকারী শাস্তির আওতাভুক্ত।

শরী‘আতে মদ্যপানের শাস্তি বেত্রাঘাত। হাদীস শরীফে আছে,

«من شرب الخمر فاجلدوه ثم إذا شرب فاجلدوه ثم إذا شرب فاجلدوه ثم إذا شرب في الرابعة فاقتلوه».

“যে লোক মদ্যপান করে তাকে বেত্রাঘাত কর। আবার পান করলে আবার বেত্রাঘাত কর। আবার পান করলে আবার বেত্রাঘাত কর। চতুর্থবার পান করলে হত্যা কর।”

তবে অধিকাংশ আলেমের মতে এ হাদীসে বর্ণিত হত্যার হুকুম রহিত হয়ে গেছে। কেউ কেউ বলেন, এ হুকুম রহিত হয় নি, বলবৎ আছে। প্রয়োজনে বিচারক বা শাসক তা‘যীর (দণ্ড) হিসেবে তা প্রয়োগ করবে।

বেত্রাঘাতের পরিমাণ চল্লিশটি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় জীবদ্দশায় এ সংখ্যা কার্যকর করেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুও এ সংখ্যা ঠিক রাখেন। কিন্তু উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মদ্যপায়ীকে আশি বেত্রাঘাত করেন। যে সব আলেম মদপানের নির্ধারিত শাস্তি (হদ) আশি বেত্রাঘাতের কথা বলেন, তারা উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কর্মনীতির অনুসরণ করেন। যেহেতু কারও থেকে এর বিরোধিতার প্রমাণ নেই, সুতরাং এটা ইজমা।

কোনো কোনো আলেম বলেন, চল্লিশ বেত্রাঘাতই হদ, তবে আদালত প্রয়োজন বোধ করলে এর উপরে বাড়াতে পারে তা‘যীর হিসেবে। যেমন, কারও যদি নেশা পান করা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয় এবং চল্লিশ বেত্রাঘাতে অভ্যাস পরিত্যাগ না হয়, তাহলে আদালত তার ক্ষেত্রে সংখ্যা বাড়াতে পারে। চল্লিশটি হবে হদ এবং বর্ধিত সংখ্যা তা‘যীর (দণ্ড)।

চার. চুরি

৩৫. হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, শরী‘আতের পরিভাষায় চুরি বলা হয়:

أخذ مال الغير على سبيل الخفية نصابا محرزا للتمول غير متسارع إليه الفساد من غير تأويل ولا شبهة.

“অন্যের মাল গোপনে নিয়ে আসা, যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়, সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে হিফাযত করে রাখা হয়, যা দ্রুত নষ্ট না হয় এবং কোনো ব্যাখ্যা বা সন্দেহের অবকাশ না থাকে।”[4]

চুরির শাস্তি চোরের হাত কর্তন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلسَّارِقُ وَٱلسَّارِقَةُ فَٱقۡطَعُوٓاْ أَيۡدِيَهُمَا جَزَآءَۢ بِمَا كَسَبَا نَكَٰلٗا مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٣٨﴾ [المائ‍دة: ٣٨]

“পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের হস্তচ্ছেদন কর। এটা তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আদর্শ দণ্ড। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩৮]

কর্তন করা হবে ডান হাতের কব্জি থেকে। হাদীস থেকে এটা প্রমাণিত। অপহরণকারী, ছিনতাইকারী ও আত্মসাৎকারীর হাত কাটা যাবে না। হাদীসে আছে, রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ليس على المنتهب ولا على المختلس ولا على الخائن قطع».

“অপহরণকারী, ছিনতাইকারী ও আত্মসাৎকারীর হাত কর্তন হবে না।” তবে এদের ওপর তা‘যীর বা দণ্ড আসবে, যেমন, চুরির শর্ত পূরণ না হলে তা‘যীর আসে। উদাহরণস্বরূপ, চুরির মাল যদি নিসাব পরিমাণ না হয়, তখন হাত কাটা যাবে না বটে; কিন্তু তা‘যীর ওয়াজিব হবে।

পাঁচ. হারাবা (ডাকাতি)

৩৬. হারাবা একটি অপরাধ। এর অর্থ পথিকের ওপর প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে জোরপূর্বক তার মালামাল লুট করা এবং এমন ত্রাস সৃষ্টি করা যার কারণে সে পথে লোক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ কাজ একজনে করুক বা দলবদ্ধ হয়ে করুক, সংগে অস্ত্র থাকুক বা না থাকুক,[5] শহরের মধ্যে হোক বা বাইরে, তাতে অপরাধের মধ্যে কোনো তারতম্য হবে না। আল্লাহ তা‘আলা এ অপরাধের শাস্তির কথা নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণনা করেন।

﴿إِنَّمَا جَزَٰٓؤُاْ ٱلَّذِينَ يُحَارِبُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَسۡعَوۡنَ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوٓاْ أَوۡ يُصَلَّبُوٓاْ أَوۡ تُقَطَّعَ أَيۡدِيهِمۡ وَأَرۡجُلُهُم مِّنۡ خِلَٰفٍ أَوۡ يُنفَوۡاْ مِنَ ٱلۡأَرۡضِۚ ذَٰلِكَ لَهُمۡ خِزۡيٞ فِي ٱلدُّنۡيَاۖ وَلَهُمۡ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ٣٣ إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ مِن قَبۡلِ أَن تَقۡدِرُواْ عَلَيۡهِمۡۖ فَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣٤﴾ [المائ‍دة: ٣٣،  ٣٤]

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাংগামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ান হবে অথবা তাদের হাত পা বিপরীত দিকে থেকে কেটে ফেলা হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। কিন্তু যারা তোমাদের আয়ত্তাধীনে আসার পূর্বে তওবা করে তাদের জন্য নয়। জেনে রেখ আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩৩-৩৪]

উক্ত আয়াতের ভিত্তিতে ও ফকীহগণের বিশ্লেষণমতে ডাকাতির শাস্তি নিম্নরূপ: ডাকাত যদি হত্যা করে ও মাল লুট করে তা হলে তাকে হত্যা করা হবে ও শূলে চড়ান হবে। আর যদি হত্যা করে মাল লুট না করে তা হলে হত্যা করা হবে কিন্তু শূলে চড়ান হবে না। যদি মাল লুণ্ঠন করে হত্যা না করে, তা হলে তার হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে। আর যদি হত্যা ও লুণ্ঠন না করে শুধু পথে ত্রাস সৃষ্টি করে, তবে তাকে নির্বাসনে দিতে হবে। মালেকী মাযহাব মতে, ডাকাত যদি শুধু লুণ্ঠণ করে, হত্যা না করে তাহলে তাকে হত্যা করা, শূলে চড়ানো ও হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কর্তনের ব্যাপারে আদালতের ইখতিয়ার থাকবে। কিন্তু ডাকাত যদি কেবল রাস্তায় ত্রাস সৃষ্টি করে, হত্যা ও লুণ্ঠণ না করে তাহলে তাকে হত্যা করা, শূলে চড়ানো, হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কর্তন করা ও নির্বাসিত করার ব্যাপারে বিচারক বা শাসকের ইখতিয়ার থাকবে।[6]

আয়াতে উল্লিখিত নির্বাসনের অর্থ অপরাধীকে অন্য শহরে বন্দী করে রাখা। এ সংক্রান্ত যতগুলো ব্যাখ্যা আছে তন্মধ্যে এ ব্যাখ্যাই সর্বোত্তম। আর হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কর্তনের অর্থ, ডান হাত ও বাম পা কর্তন করা।[7] অপরাধ যে ঘটায় ও যে তাকে সহায়তা করে উভয়ের শাস্তি একই। কেননা সহায়তাকারীর শক্তি ও সাহায্য পেয়েই সে অপরাধ ঘটাতে সক্ষম হয়। এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী ডাকাতদলের মাত্র একজনও যদি হত্যাকাণ্ড ঘটায় এবং বাকী সবাই তাকে সাহায্য করে তবে জমহুরদের মতে দলের সবাইকে হত্যা করা হবে, সংখ্যায় যদি তারা একশজনও হয়। খুলাফায়ে রাশেদীনের ‘আমল থেকে এ নিয়ম প্রচলিত আছে। উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু লড়াইকারীদের সাথে পর্যক্ষেণকারীদেরও হত্যা করেছিলেন।[8]

ছয়. বিদ্রোহ

৩৭. সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বৈধ দাবি নিয়ে একটি শক্তিশালী দলের অভ্যুত্থানকে বিদ্রোহ বলে।

বিদ্রোহীদের শাস্তি: বিদ্রোহীরা যদি প্রকাশ্যভাবে সরকারের অবাধ্য হয়, নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকে, সরকারের প্রাপ্য আদায়ে অস্বীকৃতি জানায় এবং ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে নামে ও লড়াই করার প্রস্তুতি নেয়, তারা নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে বিকল্প শাসক ঠিক করুক বা না করুক, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে। এটাই তাদের শাস্তি। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, বিদ্রোহীরা যদি প্রথমে কার্যত লড়াই শুরু নাও করে তবুও মুসলিম শাসককে তাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালাতে হবে। কেননা তাদের জড়ো হওয়া ও লড়াইয়ের আয়োজন করাই প্রমাণ করে যে, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তারা অগ্রসর হচ্ছে এবং যুদ্ধ করতে তারা সংকল্পবদ্ধ। তাই সরকারের উচিৎ তাদের অপতৎপরতা চরমে পৌঁছার আগে ও তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা অসম্ভব হয়ে উঠার পূর্বে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। তবে লড়াই শুরু করার পূর্বে সরকারের কর্তব্য তাদেরকে চিন্ত-ভাবনা করার জন্য কিছু অবকাশ দেওয়া। যদি তারা আনুগত্য মেনে নেয় তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আর লড়াই করা বৈধ নয়। কিন্তু সাড়া না দিলে অবিলম্বে অভিযান চালাতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَإِنۢ بَغَتۡ إِحۡدَىٰهُمَا عَلَى ٱلۡأُخۡرَىٰ فَقَٰتِلُواْ ٱلَّتِي تَبۡغِي حَتَّىٰ تَفِيٓءَ إِلَىٰٓ أَمۡرِ ٱللَّهِ﴾ [الحجرات: ٩]

“যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।” [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ৯]

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করাটাই তাদের শাস্তি। অর্থাৎ বিদ্রোহ দমন করার জন্য ও বিদ্রোহীদের বশে আনার জন্য যতটুকু রক্তপাত ও সম্পদ হরণ করা প্রয়োজন ততটুকু করা বৈধ। যদি তারা রণে ক্ষ্যান্ত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধ করা ওয়াজিব। তবে বিদ্রোহ করার অপরাধে আদালত তাদেরকে তা‘যীর দণ্ড দিতে পারবে।

এখানে লক্ষণীয় যে, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সরকারের দমন অভিযানে শাস্তির সেই চিরাচরিত অর্থ দৃষ্টিগোচর হয় না, যা ব্যক্তির ওপরে প্রয়োগ হলে দেখা যায়; বরং এটাকে বলা যায় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরকারের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু ফকীহগণ একে হুদুদের মধ্যে গণ্য করেন। কেননা এর মধ্যে বিদ্রোহীদের হত্যার বৈধতা নিহিত আছে। শাস্তি হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে এ হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা আল্লাহর হক হিসেবে ওয়াজিব। ফকীহদের বক্তব্য এখানে সুস্পষ্ট। সে কারণে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গৃহীত লড়াইকে হুদুদের মধ্যে গণ্য করতে কেউ বিরোধিতা করে নি।

সাত. মুরতাদ

৩৮. মুরতাদের আভিধানিক অর্থ ত্যাগকারী, প্রত্যাবর্তনকারী। শরী‘আতের পরিভাষায় ইসলাম ত্যাগকারীকে বলা হয় মুরতাদ। ত্যাগ করার অর্থ: তার থেকে এমন কিছু আচরণ প্রকাশ পায়, যা তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়। যেমন, দীনের সুষ্পষ্ট কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা অথবা ইসলামকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা অথবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গাল-মন্দ করা।

মুরতাদ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত আছে। যেমন, জ্ঞান ও সংকল্পের অধিকারী হওয়া। সুতরং পাগল ও অবুঝ বালকের ধর্মত্যাগ গ্রহণগোগ্য নয়। মাতাল না হওয়া। তাই নেশার কারণে যার জ্ঞান লোপ পেয়েছে তার ধর্মত্যাগ ধর্তব্য নয়। অনুরূপ যুলুম-নিপীড়নে বাধ্য হয়ে যে মৌখিকভাবে ধর্মত্যাগ করে; কিন্তু অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় থাকে (মুকরাহ) সেও মুরতাদ নয়। মুরতাদ হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়া শর্ত নয়। হানাফীদের নিকট বালেগ হওয়াও শর্ত নয়। তবে অন্য ফকীদদের মতে বালেগ হওয়া শর্ত।

মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من بدل دينه فاقتلوه».

“যে ব্যক্তি দীন পরিবর্তন করে তাকে হত্যা কর।”

হত্যা কার্যকর করার পূর্বে মুরতাদকে তিন দিনের অবকাশ দেওয়া হবে। হয়তো ভুল পথ ছেড়ে সে স্বধর্মে ফিরে আসবে। এ অবকাশ দেওয়া জমহুরদের মতে ওয়াজিব, হানাফীদের মতে মুস্তাহাব। অবকাশকালীন সময়ে যদি সে ফিরে আসে, তবে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়ে যাবে। অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে।


[1]  আল আহকামুস সুলতানিয়্যাহ লিল মাওয়ারদী, পৃ-২১২।

[2] বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২য় খণ্ড, পৃ-৩৬৪-৩৬৫। আল-মাবসূত ৯ম খণ্ড, পৃ-৪৪-৪৫।

[3] আল-মুগনী ৮ম খণ্ড, পৃ-২১৫। বাদায়ে‘উস  সানায়ে‘ঈ ৭ম খণ্ড, পৃ-৪০।

[4] আল ইনায়াতু ‘আলাল হিদায়াহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-২২৬।

[5] বাদায়িউস সানা‘ঈ, ৭ম খণ্ড, পৃ-৯১-৯২, শরহুল খুরাশী, ৮ম খণ্ড, পৃ-১০৪।

[6] আস সিয়াসাতুশ শর‘য়িয়্যাহ লি ইবন তাইমিয়্যাহ, পৃ-৮২-৮৩, আল মুগনী ৮ম খণ্ড, পৃ-২২৮।

[7] আস সিয়াসাতুশ শর‘য়িয়্যাহ, পৃ-৮৩, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২য় খণ্ড, পৃ-২৮০, শরহুল খুরাশী, ৮ম খণ্ড, পৃ-১০৫-১০৬।

[8] প্রাগুক্ত।