A Reply to Christian Missionary 2

মোদ্দাকথা, ইসহাক আলাইহিস সালাম, ইসমাঈল আলাইহিস সালামের চেয়ে ১৪ বছরের ছোট ছিলেন। আরও পরিষ্কারভাবে বললে—ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এবং ইসহাক আলাইহিস সালামের মধ্যে ১৪ বছরের একটা টাইম-গ্যাপ থেকে যায়। এতটুকু কি ক্লিয়ার?

আহসান আঙ্কেল আবার ‘হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।

‘তাহলে, এখান থেকে, অর্থাৎ বাইবেল থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে—ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ইসমাঈল আলাইহিস সালামের জন্মের পরে আরও ১৪ বছর পর্যন্ত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কেবল একজন সন্তানেরই পিতা ছিলেন। মানে তখন শুধু তার সন্তান ছিলেন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। রাইট?

‘হুম।

‘এখন, আমরা আবার বাইবেলের সেই অংশে ফিরে যাই, যে অংশে বলা হচ্ছে—“তোমার পুত্রকে, তোমার একমাত্র পুত্রকে নিয়ে যাও আমার দেখাননা পর্বতে। দেখুন আঙ্কেল, বাইবেল কিন্তু খুব স্পষ্ট করেই বলছে—“তোমার একমাত্র পুত্রকে। এখন আমরা যদি খ্রিষ্টান মিশনারিদের কথামতো ধরেও নিই যে, এখানে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নয়, ইসহাক আলাইহিস সালামকে বুঝানো হচ্ছে, তাহলে তোমার একমাত্র পুত্রকে’ বলার কারণ কী? ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের পর তো ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মোট দুটো সন্তান হয়ে গেল। এখানে তো বলা উচিত তোমার পুত্রদের মধ্য থেকে অথবা ‘তোমার দুই পুত্রের মধ্য থেকে’ ইত্যাদি। কারণ, এই ঘটনায় যদি ইসহাক আলাইহিস সালামকে টানি, তাহলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সন্তান সংখ্যা দাঁড়ায় দুজন। তাহলে দুজন সন্তান থাকা সত্ত্বেও এখানে বাইবেল কেন ‘তোমার একমাত্র পুত্রকে বলল? এটি এজন্যেই যে, এই একমাত্র পুত্র ছিলেন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। এই ঘটনা অর্থাৎ সন্তান কুরবানীর ঘটনা যখন ঘটছে, তখন ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মও হয়নি। তখন কেবল ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একজনই সন্তান ছিল— ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। তাহলে বাইবেল এবং বাইবেলীয় ইতিহাস মতে— ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সেদিন ইসহাক আলাইহিস সালামকে নয়, ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানী দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

এতটুকু বলে সাজিদ একটু থামল। আহসান আঙ্কেল বললেন—“কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে, সাজিদ। খ্রিষ্টানরা ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে নবী হিশেবে এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বৈধ পুত্র হিশেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না। কেন দিতে চায় না, জানো? কারণ, ইসমাঈল আলাইহিস সালামের জন্ম হয়েছিল একজন দাসীর গর্ভে, তাই।

আহসান আঙ্কেলের এই কথা শুনে সাজিদ হাসল। এরকম সিরিয়াস ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে সে কখনো হাসে না। আজ ব্যতিক্রম হলো। হাসি থামিয়ে বলল—কিন্তু আঙ্কেল, বাইবেল যে এ ব্যাপারে একদম ভিন্ন কথা বলে।

‘যেমন?’ আহসান আঙ্কেলের উৎসুক প্রশ্ন।

বাইবেলই বলছে, হাজেরা আলাইহাস সালাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বৈধ

স্ত্রী ছিলেন। বাইবেলের জেনেসিসে বলা হয়েছে—Sara, Abram’s wife, took Hagar the Egyptian, her slave-girl, and gave her to her husband Abram as his wife.”[১]

অর্থাৎ ‘সারা, যিনি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্ত্রী ছিলেন, তার দাসী হাজেরা আলাইহাস সালামকে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে দিলেন স্ত্রী হিশেবে।” এখান থেকে একেবারে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে হাজেরা আলাইহাস সালাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বৈধ স্ত্রী ছিলেন।

আহসান আঙ্কেল বললেন, ‘আই সী।

‘তাছাড়া, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম শুধু মুসলিম নয়, খ্রিষ্টান এবং ইহুদীদের কাছেও একজন সম্মানিত প্রফেট। তাহলে তারা কীভাবে এটা ভেবে নিতে পারে যে এরকম সম্মানিত একজন প্রফেটের কারও সাথে অবৈধ সম্পর্ক থাকতে পারে এবং অবৈধ সন্তানও আসতে পারে?

সাজিদের কথায় ভীষণ যুক্তি আছে। আসলেই তো। যাকে নবী হিশেবে মানে, তার বিরুদ্ধে এরা কীভাবে এরকম ধারণা পোষণ করে?

আহসান আঙ্কেল বললেন—“তোমার কথা বুঝতে পেরেছি আমি। তবে এ ব্যাপারে তাদের কাছে একটি যুক্তি আছে।

তারা বলে—শিশু ইসমাঈল নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সন্তান হিশেবে ততদিন পর্যন্ত স্বীকৃত ছিলেন যতদিন ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্ম হয়নি। ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সাথে সাথে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সন্তান হবার মর্যাদা হারিয়ে ফেলেন।

গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি পান করল সাজিদ। এরপর গ্লাসটি টেবিলের ওপরে রাখতে গিয়ে বলল, “এটাও কিন্তু একটা বাইবেল বিরোধী ঈমান, আঙ্কেল।

সাজিদের কথায় আহসান আঙ্কেল বেশ অবাক হলেন। অবাক হলাম আমিও। চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে আহসান আঙ্কেল জানতে চাইলেন—“কোনটা?

সাজিদ বলতে লাগল—একটু আগে যে বললেন, যতদিন ইসহাক আলাইহিস সালাম জন্মাননি, ততদিন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পুত্র ছিলেন। ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সাথে সাথে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পুত্রের মর্যাদা হারান।

‘হ্যাঁ। তারা এরকমই বলে জবাব দিলেন আহসান আঙ্কেল। ‘কিন্তু বাইবেল কী বলে জানেন?

‘কী?

বাইবেল বলছে -And his sons Isaac and Ishmael buried him (Abraham) in the cave of Machpelah.(১)

অর্থাৎ-ইবরাহীমের পুত্র ইসহাক এবং ইসমাঈল ইবরাহীমকে দাফন করল মাকপেলাহ নামক একটি গুহায়। দেখুন, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পরেও বাইবেল বলছে-And his sons Isaac and Ismael. লক্ষ্যণীয়, বাইবেল কিন্তু ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পরেও ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে তার পুত্র বলেই স্বীকৃতি দিচ্ছে, আর খ্রিষ্টান মিশনারিরা কিনা ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের পরেই ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে ইবরাহীম আলাইহিস সলামের পুত্রের খাতা থেকে বাতিল করে দিচ্ছে। এ যেন বাইবেলের ওপরেই একধরনের খবরদারি!’

আসলেই তো! সাজিদের কথা শুনে মনে হচ্ছে খ্রিষ্টান মিশনারিগুলো তাদের বাইবেলটা ভালোমতো পড়েও দেখেনি। পড়লে তো এরকম আহাম্মকি যুক্তি দেখানোর কথা নয়।

আহসান আঙ্কেল বললেন—“বেশ যৌক্তিক আলোচনা; কিন্তু মিশনারিরা বলে, এই ঘটনায় কুরআনও ইসমাঈল নয়, ইসহাকের দিকেই নাকি ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ কুরআনের ইঙ্গিত থেকেও নাকি জানা যায়, সেদিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইসমাঈলকে নয়, পুত্র ইসহাককেই কুরবানী দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

আহসান আঙ্কেলের কথা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। কুরআন এরকম একটি কথা কীভাবে বলতে পারে?

সাজিদ বলল—“যেমন?

আহসান আঙ্কেল বলতে লাগলেন—‘সূরা সাফফাতের ৯৯ থেকে ১১২ নম্বর আয়াতগুলো দেখো

[৯৯] সে (ইবরাহীম) বলল, আমি আমার রবের পথেই চলব। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে পথ দেখাবেন।

[১০০] হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সৎকর্মশীল একটি পুত্র সন্তান দান করুন।

[১০১] এরপর, আমি তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।

[১০২] অতঃপর সে (পুত্র সন্তানটি) যখন তার পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছাল, তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, ‘বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমায় আমি জবেহ করছি। এখন বলল, তোমার অভিমত কী? সে বলল—হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন।

[১০৩] দুজনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল। আর ইবরাহীম তাকে উপুড়

করে শুইয়ে দিল।

[১০৪] আমি তাকে ডাক দিলাম ‘হে ইবরাহীম!

[১০৫] তুমি তোমার ওয়াদা পূর্ণ করেছ। নিশ্চয়ই, আল্লাহ এভাবে সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করেন।

[১০৬] এটি ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা।

[১০৭] এবং আমি তাকে এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে ছাড়িয়ে নিলাম।

[১০৮] এবং আমি তাকে পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম।

[১০৯] ইবরাহীমের ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক।

[১১০] এভাবেই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করেন।

[১১১] সে (ইবরাহীম) ছিল সৎকর্মশীলদের একজন।

[১১২] আর তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের, যে ছিল সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী।[২]

এখান থেকে খ্রিষ্টান মিশনারিরা বলতে চায় যে, আয়াতের প্রথম দিকে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু তার নাম উল্লেখ করা নেই। সূরাটিতে আরও কিছুদূর পরে এসে আবারও সুসংবাদ সংবলিত একটি পুত্রের কথা বলা হয় এবং নামও উল্লেখ করা হয়। এবার যার নাম উল্লেখ করা হয় তিনি হলেন ইসহাক আলাইহিস সালাম, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নয়। অর্থাৎ কুরআন থেকেই সুস্পষ্ট যে, সেদিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে নয়, ইসহাক আলাইহিস সালামকেই কুরবানী করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন।

সাজিদ একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘আঙ্কেল, মিশনারিদের এই যুক্তি খুবই দুর্বল।

কিভাবে ?’ প্রশ্ন করলেন আহসান আঙ্কেল।

প্রথমে সূরা সাফফাতের একশতম আয়াতটি খেয়াল করুন। ওখানে কী বলা হচ্ছে? বলা ছে—হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সৎকর্মশীল একজন পুত্র সন্তান দান করুন। এখন আমাদের জানতে হবে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই প্রার্থনা কবে করেছিলেন। এই প্রার্থনা তিনি তখন করেছিলেন যখন তিনি সন্তানহীন ছিলেন। আগেই বলেছি, জীবনের দীর্ঘ চুরাশি বছর পর্যন্ত তিনি কোনো সন্তানের মুখ দেখেননি। ঠিক?

“হ্যাঁ” বললাম আমি।

এর পরের আয়াতে কী আছে দেখুন। পরের আয়াতে আছে এরপর আমি তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র-সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।

খেয়াল করুন, সন্তানহীন অবস্থায় তিনি একজন সন্তানের জন্য প্রার্থনা করলেন। এরপর আল্লাহ তাকে পুত্র-সন্তান দান করলেন। সে কে তাহলে? ইহুদী, খ্রিষ্টান ও ইসলাম এই তিন ধর্মের স্কলারগণ এই ব্যাপারে একমত যে—প্রার্থনার পরে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে-সন্তান লাভ করেছিলেন তিনি-ই ইসমাঈল আলাইহিস সালাম।

তাহলে, ঘটনার পরম্পরা এবং ইতিহাস বলছে—প্রথম সন্তান ইসহাক আলাইহিস সালাম নয়, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। এইটুকু কি ক্লিয়ার?’

আমরা উভয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। সাজিদ আবার বলতে লাগল, এরপরের আয়াতে যান। বলা হচ্ছে—“অতঃপর পুত্র-সন্তানটি যখন তার পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পোঁছাল, তখন ইবরাহীম বলল, ‘বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন বললো, এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কী? সে বলল, “হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন।

আগের দুই আয়াত থেকে একটি ব্যাপার ক্লিয়ার যে, উক্ত সন্তান ছিলেন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম, ইসহাক আলাইহিস সালাম নন এবং যাকে কুরবানী করার স্বপ্ন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দেখলেন, সেও তাহলে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম।

আগের অংশ টুকু পড়তে
[এখানে ক্লিক করুন]পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

রিফারেন্স
১ জেনেসিস : ১৬:৩
২ সূরা সাফফাত, ৩৭ : ৯৯-১১২

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন