মূল: প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২। লেখক: আরিফ আজাদ । ওয়েব সম্পাদনা: আবু বক্কার ওয়াইস বিন আমর

ভদ্রলোকের তারুণ্যদীপ্ত চেহারা। চুল আর দাড়িতে পাক ধরায় মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই যেন বয়স বেড়ে গেছে; কিন্তু চেহারার মধ্যে তারুণ্যের ছাপ স্পষ্ট। এই মুহূর্তে তিনি খুব মন খারাপ করে আমার সামনে বসে আছেন। কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের মুখ ভারী হলে আশপাশের পরিবেশ গুমোট আকার ধারণ করে। ভদ্রলোকও সেরকম একজন মানুষ। মনখারাপ অবস্থাটা ওনার সাথে একদমই যাচ্ছে না।

তার ফোন বেজে উঠল। কপাল কুঁচকে তিনি ফোনের দিকে তাকালেন। দেখে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তিনি খুবই বিরক্তি বোধ করছেন। ফোনটি বাজতে বাজতেই বন্ধ হয়ে গেল। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করলেন; কিন্তু কৃত্রিম হাসিতে তাকে একদম মানায়নি। তাকে প্রশ্ন করলাম, “তো, আপনি খ্রিষ্টান মিশনারিদের কোথায় পেলেন?

প্রশ্ন শুনে তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন। বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি পান করলেন। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “আমার এক বৃটিশ বন্ধু লন্ডনে মিশনারিদের একটি দাওয়া-প্রোগ্রামে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল; সেখানেই।

‘আপনার বন্ধু কি মুসলিম?’

‘না। খ্রিষ্টান।

“ও আচ্ছা।

ভদ্রলোকের সমস্যা সম্পর্কে একটু বলে নেওয়া দরকার। তিনি সম্প্রতি খ্রিষ্টান মিশনারিদের কাছ থেকে একটি তথ্য পেয়েছেন। এই তথ্যটি এতটাই বিদঘুটে যে, এর সত্যাসত্য না জানা অবধি ভদ্রলোক কোনো শান্তি পাচ্ছেন না। তথ্যটি হলো—কুরআনে নির্দিষ্ট করে বলা নেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সেদিন ঠিক কাকে কুরবানী করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে নাকি ইসহাক আলাইহিস সালামকে? হাদীসেও এটির তেমন কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না; কিন্তু মুসলিমরা নাকি অন্ধভাবেই বিশ্বাস করে যে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সেদিন ইসমাঈল আলাইহিস সালামকেই কুরবানী করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কুরআন এই ইস্যুতে কোনো নির্দিষ্ট নাম ব্যবহার না করলেও বাইবেলে উল্লেখ পাওয়া যায়, সেদিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে নয়, ইসহাক আলাইহিস সালামকে কুরবানী করতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

আমাদের আলাপ আরও কিছুদূর গড়াল। বললাম, “তো, এখন আপনি কী বিশ্বাস করছেন?

ভদ্রলোক আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। সম্ভবত তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এরই মধ্যে আমাদের মাঝে সাজিদ এসে উপস্থিত। হাতে একগাদা বই। লাইব্রেরি থেকে ফিরেছে। এসেই সে আমার পাশে ধপাস করে বসল। কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। কাঁধ থেকে ব্যাগটি টেবিলে রাখতে রাখতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল—“আচ্ছা, তোকে যদি বলি ক্লাসিক্যাল একটি সীরাতগ্রন্থের নাম বলতে, তুই কোন সীরাতটির কথা বলবি?’

তার চুল উসকোখুসকো। চশমার ফ্রেম ঠিক করতে করতে উত্তর পাবার আশায় সে আমার দিকে তাকাল।

আমি বললাম—‘ইবনু ইসহাক অথবা ইবনু হিশামের সীরাতগ্রন্থ। যদি আরও আপডেটেড সীরাতের কথা জানতে চাস তাহলে হাল আমলের আর রাহীকুল মাখতৃমের কথা বলতে পারি।

সাজিদ জোরে একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “হুম। আমি জানতাম তুই এই উত্তরটাই দিবি। ৯৫ ভাগ শিক্ষিত বাঙালী মুসলিম এই উত্তরই দেবে।

‘তুই কী বলতে চাচ্ছিস, ঠিক বুঝতে পারছি না।

সে আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সীরাতের নাম উঠলেই লাফ দিয়ে ইবনু ইসহাক অথবা ইবনু হিশামে চলে যাস; কিন্তু বাংলা ভাষায় যে অত্যন্ত ক্লাসিক্যাল সীরাত মজুদ আছে, সেটা কি জানিস?

কয়েক মুহূর্ত ভাবলাম। বাংলা ভাষায় সীরাত! তাও আবার ক্লাসিক্যাল পর্যায়ের! ঠিক মনে করতে পারছি না। হয়তো বা আমার জানা নেই। বললাম—“না তো। কোনটার কথা বলছিস?” সাজিদ বলল, “মাওলানা মুহাম্মদ আকরাম খাঁ এর মোস্তফা চরিত’। ‘বইটির কথা আমি অনেক শুনেছি। কখনো পড়া হয়নি অবশ্য। এটি যে এত উঁচু এবং ক্ল্যাসিক্যাল পর্যায়ের সীরাত সেটাই আমি জানতাম না। বললাম—বলিস কী? এত বিখ্যাত সীরাত অথচ আমিই জানি না? বাই দ্য ওয়ে, তুই কি পড়েছিস সেটি?

সাজিদ কোনো উত্তর দেয়নি। আমি জানতাম সে উত্তর দেবে না। পড়েছে তো অবশ্যই, নয়তো এখানে এসে এটা নিয়ে লেকচার ঝারত না। পাশে বোমা ফাটলেও যার মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না, সে এসেই যখন এত্তবড় লেকচার দিয়ে দিল, তাহলে নিশ্চিত সামথিং ইজ দেয়ার।

আমাদের আলাপের মাঝখানে ভদ্রলোক কথা বলে উঠলেন। ও হ্যাঁ, ভদ্রলোকের নাম বলা হয়নি। তার নাম আহসান ইমতিয়াজ। আহসান সাহেব সাজিদের দিকে তাকিয়ে বললেন—“তুমিই কি সাজিদ?’

সাজিদ তার দিকে তাকাল। সে মনে হয় এতক্ষণ খেয়াল করেনি। সালাম দিয়ে বলল, ‘জি, আমিই সাজিদ।

ভদ্রলোক ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম’ বলে সাজিদের দিকে হাত বাড়াল। আমি বললাম‘সাজিদ, আহসান আঙ্কেল সেই সকাল দশটা থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছেন।

সাজিদের প্রশ্ন, ‘তুই কি গতকাল তার কথাই বলছিলি?

‘হ্যাঁ।

সাজিদ আহসান আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে বলল-“সরি আঙ্কেল! আসলে আজ আমার এক্সট্রা ক্লাস ছিল বলে লেইট হয়ে গেল।

“না না! ইটস ওকে আহসান আঙ্কেল বললেন। এরপর নানা রকম আলাপের মাধ্যমে আহসান আঙ্কেল তার মনের খচখচানির ব্যাপারটি সাজিদকে খুলে বলতে লাগলেন—“আসলে হয়েছে কি জাননা, খ্রিষ্টান মিশনারিদের পাল্লায় পড়ে খুব শঙ্কার মধ্যে আছি। তারা বলতে চায় যে—ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে নয়, ইসহাক আলাইহিস সালামকেই সেদিন কুরবানী দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাইবেলে নাকি এমনটাই বলা আছে।

সাজিদ চুপচাপ, ঠান্ডা মাথায় সবকিছু শুনে বলল—‘বাইবেলের যে জায়গায় ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বদলে ইসহাক আলাইহিস সালামের কথা আছে তা কি আপনি পড়েছেন?

“হ্যাঁ’ বললেন আহসান আঙ্কেল।

‘মনে আছে সেই অংশটুকু?

‘হ্যাঁ’

‘বলুন তো।

আহসান আঙ্কেল এবার বাইবেলের সেই অংশটুকু উদ্ধৃত করে বললেন— ‘বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের জেনেসিস অধ্যায়ে বলা আছে—And He (God) said, ‘Take now thy son, thine only (son) whom thou lovest, and get thee into the land of Moriah; and offer him there for a burnt offering upon one of the mountains which I will tell thee of.!!

এই রেফারেন্স টেনে মিশনারিরা প্রমাণ করতে চায় যে সেদিন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইসমাইলকে নয়; বরং ইসহাককে কুরবানী দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সাজিদ বলল, “আঙ্কেল, আপনি এইমাত্র বাইবেলের যে অংশ উদ্ধৃত করেছেন তাতে বলা আছে—“ঈশ্বর ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে আদেশ দিচ্ছেন যে, তার একমাত্র সন্তান, যাকে তিনি নিজপ্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন, তাকে নিয়ে ঈশ্বরের দেখানো পর্বতে গিয়ে কুরবানী দিতে।

আহসান আঙ্কেল বললেন, হ্যাঁ; কিন্তু বাইবেল এও বলছে যে সেই পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নয়, ইসহাক আলাইহিস সালাম।

সাজিদ বলল ‘সেই আলোচনায় আমরা একটু পরে আসছি। আগে আপনি এই অংশটুকু খেয়াল করুন। এখানে ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে আদেশ করে বলা হচ্ছে—Take your only son. বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার জন্য বাইবেলের এই শব্দচয়ন কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। মূল হিব্রু ভাষায় Only শব্দের জন্য যে হিব্রু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো—Yachiyd. হিব্ৰুতে Yachiyd শব্দ দিয়ে ‘এবসলিউট সিঙ্গুলারিটি’ বোঝায়। মানে—কেবল একজনই—Just One. আমি আর আহসান আঙ্কেল মনোযোগ দিয়ে সাজিদের কথা শুনছি—“তাহলে, ঈশ্বর যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তোমার একমাত্র পুত্রকে নিয়ে যাও’ বলে আদেশ দিচ্ছেন, তখন সেই আদেশে আসলে কাকে বুঝানো হচ্ছে? ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে? না ইসহাক আলাইহিস সালামকে?

আমরা দুজনই চুপ করে আছি। সাজিদ বলে চলল—এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের এই ঘটনার পেছনের ইতিহাস খতিয়ে দেখতে হবে। ইহুদী, খ্রিষ্টান, মুসলিম অর্থাৎ আব্রাহামিক ধর্মের সকল স্কলারগণ এই ব্যাপারে একমত যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম জীবনের অধিকাংশ সময় সন্তানহীন ছিলেন। তখন তার স্ত্রী ছিলেন সারা আলাইহাস সালাম। যখন সারা আলাইহাস সালামের গর্ভে কোনো সন্তানের জন্ম হচ্ছিল না, তখন তিনি তার একজন দাসীর সাথে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বিয়ের বন্দোবস্ত করেন। সেই দাসীর নাম ছিল হাজেরা আলাইহাস সালাম। রাইট?”

“হুম” আমি বললাম

‘তাদের বিয়ের পরে হাজেরা আলাইহাস সালামের গর্ভ থেকে ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ভূমিষ্ট হন যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বয়স ছিল চুরাশি বছর, তাই না?

আহসান আঙ্কেল মাথা নেড়ে সায় দিলেন। সাজিদ বলতে লাগল—অর্থাৎ ইহুদী, খ্রিষ্টান এবং ইসলাম ধর্মের স্কলারগণ এই ব্যাপারে একমত যে, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রথম পুত্র। ইসমাঈলের বয়স যখন ১৪ বছর, তখন সারা আলাইহাস সালাম, অর্থাৎ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রথম স্ত্রী, গর্ভবতী হন এবং পরে ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্ম হয়।
পরের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

রিফারেন্স
(১) জেনেসিস, ২২:২

এই ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ একে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন