বনু কুরাইজা হত্যাকাণ্ড—ঘটনার পেছনের ঘটনা (থ্রি)

সাজিদ বলল, ‘বনু কুরাইজা সম্প্রদায়কে হত্যার নির্দেশ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেননি। দিয়েছিলেন সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু৷ বনু কুরাইজাদের সামনে অপশান রাখা হয়, তারা কি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রায় মানবে, নাকি তাদের পূর্বসূরি, যিনি একসময় ইহুদী ছিলেন, সেই সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর রায় মানবে। ইহুদীরা সম্মিলিতভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাদ দিয়ে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বাছাই করেছিল এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দেওয়া রায় অনুসারেই কিন্তু তাদের হত্যা করা হয়। তাদের হত্যার রায়টি আলটিমেটলি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে আসেনি।

শাবির কাচুমাচু করে বলল, ‘তবুও, এটি একটি অমানবিক কাজ। ‘কোনটি অমানবিক?’ সাজিদের জিজ্ঞাসা। ‘এভাবে একসাথে এতগুলো ইহুদী-হত্যার নির্দেশ দেওয়াটা। সাজিদ হেসে বলল, ‘অমানবিক হবে কেন? এই আইন তো স্বয়ং ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থের-ই আইন। তাদের ধর্মগ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে এই আইনের কথা উল্লেখ করা আছে।

সাজিদের এই কথা শুনে এবার অবাক হলো বিমল দা। বলল, বুঝতে পারলাম না ঠিক।

সাজিদ বলল, ‘সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুবনু কুরাইজাদের হত্যার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেটি মূলত ইহুদী ধর্মগ্রন্থ ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি আইন। চুক্তিভঙ্গের অপরাধের জন্য এরকম আইনের শাস্তির কথা ওল্ড টেস্টামেন্টেই উল্লেখ করা আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কীরকম?

সাজিদের প্রামাণ্য জবাব, ওল্ড টেস্টামেন্টের Deuteronomy অধ্যায়ে আছে : “Thou shalt smite every male thereof with the edge of the sword : But the women, and the little ones, and the cattle, and all that is in the city, even all the spoil thereof, shalt thou take unto thyself; and thou shalt eat the spoil of thine enemies, which the LORD thy God hath given thee”

Deuteronomy: 20-25

এখানে স্পষ্ট করেই বলা আছে, ‘চুক্তিভঙ্গের জন্য প্রত্যেক পুরুষকে হত্যা করো….।’ সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন যেটি করেছিলেন, সেটি বাইবেলেরই আইন। তাহলে, ইহুদীদের আইন তত ইহুদীদের ওপরেই আরোপ করা হয়েছে। এতে তো কারও বিরোধ থাকার কথা না…।

সবাই চুপ করে আছে। একটু পরে বিমল দা বলল, “কিন্তু, বনু কুরাইজার সকল পুরুষ হত্যা করা হলো, ব্যাপারটি কেমন না? একটি গোত্রের সকল পুরুষ তো আর অপরাধ করে না। এমন অনেক পুরুষ কি সেই গোত্রে ছিল না—যারা হয়তো যুদ্ধ করেনি বা যুদ্ধ করার মতো অবস্থায়ও ছিল না? তাহলে তাদেরও কেন হত্যা করা হলো?

সাজিদ একটু থামল। এরপর বলল, “ওইদিন বনু কুরাইজার সকল পুরুষ হত্যা করা হয়নি; বরং সকল যোধা (যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম) হত্যা করা হয়েছিল। সেদিনকার ঘটনার বর্ণনায় যে-সকল হাদীস পাওয়া যায়, সবগুলোতে ‘রাজুল’ তথা ‘পুরুষ’ শব্দের পরিবর্তে ‘মোকাতেল’ তথা ‘যোদ্ধ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়।

সহীহ বুখারী-তে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বলা হয়েছে, বনু কুরাইজার ঘটনার দিন তাদের কিছু লোক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ক্ষমা করে দেন। পরে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। সুতরাং, সকল পুরুষ হত্যার যে মিথ্যা বর্ণনা আমরা শুনি, তা এই হাদীস দিয়ে বাতিল করে দেওয়া যায়। কারণ, সেদিন ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের মধ্যে অনেক নারী-পুরুষ থাকাটাই যুক্তিযুক্ত।

সাজিদ থামল। আলম ভাই তার দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলে সে ঢকঢক করে পানিটুকু গলাধঃকরণ করল। এরপর আবার বলতে শুরু করল, ‘তাহলে, আমরা দেখলাম যে

(১) বনু নাযীর এবং কায়নুকা সম্প্রদায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী। তাই তাদের রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা বেআইনি ছিল না; বরং আইনসিদ্ধ ছিল।

(২) বনু কুরাইজা সম্প্রদায় নিরপরাধ ছিল না। তারাও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অপরাধী ছিল। তাদের অপরাধ প্রথমবার ক্ষমা করা হয়। তথাপি তারা তাদের অপরাধ থেকে সরে না এসে বারবার মুসলিমদের বিরুদ্ধাচরণ করে। ফলে, তাদের রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় আনা যুক্তিযুক্ত।

(৩) বনু কুরাইজার সকল পুরুষ নয়; বরং সকল যোদ্ধ হত্যা করা হয়েছিল।

(৪) হত্যার রায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নন, দিয়েছিলেন ইহুদীদের একসময়কার সমগোত্রীয় নেতা সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু৷

(৫) হত্যার রায় দেওয়া হয়েছিল ইহুদীদের ধর্মীয় বিধানমতেই। সুতরাং, এতে আপত্তি তোলার অবকাশ নেই।

(৬) কুরাইজা গোত্রের সকলকে হত্যা করা হয়নি। যারা ক্ষমা চেয়েছিল, তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, একটি রাষ্ট্রীয় সংবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে বনু নাযীর, বনু কায়নুকা এবং বনু কুরাইজার সাথে হওয়া ঘটনাগুলো কোনোভাবেই অমানবিক নয়; বরং আইনসম্মত ছিল। এই আইন প্রয়োগ করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরং একজন ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্বই পালন করেছিলেন।

সাজিদের কথা বলা শেষ হলে আমি শাবিরের মুখের দিকে তাকালাম। বললাম, “ইশ! এতক্ষণ কী সুন্দর বাঙালি-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গুলিয়ে ফেলা গল্প শুনছিলাম। সাজিদ এসে সেগুলোকে ঠাকুরমার ঝুলি বানিয়ে দিল।

আমার কথা শুনে আলম ভাই হা-হা-হা করে হেসে উঠল। এই লোকের হাসিটি খুবই চমৎকার। বাঁধাই করে রাখার মতো।

সমাপ্ত

আগের অংশ টুকু পড়তে[এখানে ক্লিক করুন]

ব্লগ সাইটটি যদি আপনার মনের কোথাও একটুও যায়গা করে নেয় বা ভালো লেগে থাকে। তাহলে আপনিও ব্লগের কার্যক্রম কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার লেখণী পাঠাতে পারেন।আপনার লেখনী পাঠিয়ে আমাদের ফেচবুক পেজের ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে দয়াকরে নক করুন।
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান। ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে। আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই “ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন”।

আপনার মন্তব্য লিখুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন